এক বিধ্বংসী উইলোর কাব্যগাথা

অবসর নেওয়ার এত বছর পরেও বীরেন্দ্র শেবাগ কেবল একটি নাম নন, তিনি এক চিরন্তন নস্টালজিয়া। যখনই ক্রিকেটে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রশ্ন ওঠে, অবচেতনেই মনে পড়ে যায় হাতে সেই বিধ্বংসী ‘ব্রিটানিয়া’ কুঠার নিয়ে মাঠ কাঁপানো এক রাজপুত্রের কথা।

২০২১ সালের ব্রিসবেন টেস্ট, জয়ের জন্য চাই ৩২৯ রান। গ্যালারির কোণে তখনো দীর্ঘশ্বাস “শেবাগের মতো কেউ যদি আজ থাকতেন!” অবসর নেওয়ার এত বছর পরেও বীরেন্দ্র শেবাগ কেবল একটি নাম নন, তিনি এক চিরন্তন নস্টালজিয়া। যখনই ক্রিকেটে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রশ্ন ওঠে, অবচেতনেই মনে পড়ে যায় হাতে সেই বিধ্বংসী ‘ব্রিটানিয়া’ কুঠার নিয়ে মাঠ কাঁপানো এক রাজপুত্রের কথা।

আমাদের ছোটবেলার অলস দুপুরগুলো মুখর হতো শেবাগের ব্যাটের সংগীতে। টিভি স্ক্রিনে ‘ফোর্থ আম্পায়ার’ শো শেষ হতে না হতেই তিনি নামতেন, যেন রণক্ষেত্রে কোনো এক প্রাচীন যোদ্ধা। বোলার যখন প্রলয়ংকারী গতিতে ছুটে আসতেন, শেবাগ তখন উইকেটে দাঁড়িয়ে ব্যাট ঠুকতেন এক আদিম ছন্দে। ঠিক যেন মহাপ্রলয়ের আগে কোনো জটাধারী শমীবৃক্ষের তলে নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তাঁর সেই ‘স্ট্যান্ড অ্যান্ড ডেলিভার’ শটগুলো কেবল রান ছিল না, ছিল শোয়েব আখতার বা ব্রেট লির মতো গতির রাজাদের অহংকারে এক একটি শৈল্পিক কুঠারাঘাত।

স্পিনারদের জন্য শেবাগ ছিলেন এক দুঃস্বপ্ন। ২০০৮ এর গল টেস্টে যখন অজন্তা মেন্ডিসের রহস্যময় ক্যারম বলে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তখন সেই একই উইকেটে মুরালিধরনকে শাসন করেছিলেন শেবাগ। মুরালির ডেরায় গিয়ে অফসাইডের ফিল্ডারদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাউন্ডারি খুঁজে নেওয়া – এমন দুঃসাহস কেবল তাঁর পক্ষেই দেখানো সম্ভব ছিল।

একই দাপট দেখা যেত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষেও। দানিশ কানেরিয়ার বলে ইনজামাম উল হক যখন লং অন থেকে ফিল্ডার সরিয়ে নিলেন, শেবাগ ঠিক তার পরের বলেই সেই অঞ্চল দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। বীরু বলেই বুঝি সম্ভব!

সৌরভ গাঙ্গুলী যাকে সুনীল গাভাস্কারের পর ভারতের শ্রেষ্ঠ ওপেনারের মুকুট দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই মহেন্দ্র সিং ধোনির কাছে ছিলেন জীবন্ত ভিভ রিচার্ডস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আমি কাহারও লক্ষ্য নহি, আমি সকলের উপায়মাত্র।’ শেবাগের ক্যারিয়ারও ছিল অনেকটা সেরকম। তিনি নিজে কোনো লক্ষ্য ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন কোটি ভারতীয়র জয়ের সেই রাজপথ, যা বাকিদের জন্য সাফল্যের মঞ্চ তৈরি করে দিত।

মুলতান জয় করা সেই সুলতান তাঁর বিধ্বংসী প্রলয়গীত সাঙ্গ করেছেন অনেক আগে। তবু ক্রিকেটের নস্টালজিয়ায় তিনি সেই চিরস্থায়ী সুর হয়ে থাকবেন, যার রেশ কখনো কাটবার নয়। কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় যখন স্মৃতিরা ভিড় করবে, তখন দূর থেকে ভেসে আসা কোনো বাউলের একতারার মতো আমাদের মনে পড়ে যাবে সেই প্রলয় বিলাসী রাজপুত্রকে।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link