নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডের কনকনে শীতের ভোরে যখন কুয়াশার চাদর ঢেকে থাকত মাঠ, তখন থেকেই এক কিশোরের হৃদয়ে অদম্য এক জেদ জন্ম নিয়েছিল। সেই জেদ ছিল একদিন বল হাতে ২২ গজে ঝড় তোলার। কাইল মিলস -তিনি ছিলেন সেই কারিগর, যিনি জানতেন বলটাকে কীভাবে বিষণ্ণ বিকেলের রোদের মতো মায়াবী করে তুলতে হয়।
কাইল মিলসের বোলিং ছিল অনেকটা ধ্রুপদী সংগীতের মতো। খুব বেশি গতিশীল না হয়েও, তার ছিল নিখুঁত লাইন লেন্থ এবং আউটসুইং করানোর এক সহজাত ক্ষমতা। পিচের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন তিনি বলটি ছুড়তেন, তা বাতাসে কথা বলত। ব্যাটসম্যানরা তার ইন সুইঙ্গার আর আউট সুইংগারের দোলাচলে বরাবরই বিভ্রান্ত হতেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে সবসময় শেন বন্ডের মতো এক্সপ্রেস ফাস্ট বোলারদের ছায়ায় থাকতে হয়েছে। বন্ড ছিলেন ঝোড়ো বাতাস, আর মিলস ছিলেন প্রশান্ত কিন্তু গভীর নদী। চোট যখন বারবার কিউই বোলিং আক্রমণকে তছনছ করে দিয়েছে, মিলস তখন হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। তিনি ছিলেন সেই কারিগর, যিনি জানতেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে ডট বল দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হয়।

কাইল মিলসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে ওয়ানডে ক্রিকেটে। একসময় তিনি আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর বোলার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। কিউইদের হয়ে ওয়ানডেতে তার ২৪০টি উইকেট আজও তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা উইকেট সংগ্রাহকের মর্যাদায় বসিয়ে রেখেছে।
তবে কাইল মিলসের টেস্ট ক্যারিয়ার বড় না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভিলেন ছিল তার হাঁটুর চোট। টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করার জন্য যে শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, মিলসের শরীর বারবার তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজেকে ফিট রাখার জন্য তাকে অনেক সময় টেস্ট ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে হয়েছে বা বাধ্য হয়ে বিশ্রাম নিতে হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ১৭০ ওয়ানডের বিপরীতে খেলেছেন কেবল ১৯টি টেস্ট।
২০১৫ সালের বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকলেও মূল একাদশে খুব একটা সুযোগ মেলেনি। ঘরের মাঠে যখন নিউজিল্যান্ড প্রথমবারের মতো ফাইনাল খেলছে, ডাগআউটে বসে থাকা মিলস হয়তো তখন তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা ভাবছিলেন। সেই টুর্নামেন্টের পরপরই তিনি নীরবে বিদায় জানান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে। কোনো আড়ম্বর নেই, নেই কোনো বড় সংবর্ধনা। ঠিক যেমন ছিল তার শান্ত ক্যারিয়ার।

কাইল মিলস মানেই একজন পরিশ্রমী যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। তিনি শিখিয়েছেন, দলে সব সময় গতির প্রয়োজন নেই। বুদ্ধিমত্তা এবং ধৈর্য দিয়েও বিশ্বসেরা হওয়া যায়। কিউই ক্রিকেটের ইতিহাসে কাইল মিলস সবসময় সেই নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে থাকবেন, যিনি নিঃস্বার্থভাবে নিউজিল্যান্ডের আকাশী-কালো জার্সিটাকে ভালোবেসে গিয়েছেন।










