বিজয়ের মহাকাব্য নাকি এক বঞ্চনার উপাখ্যান?

ভারতের দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের সেই মহিমান্বিত ছবি আজও কোটি প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু সেই সোনালী ফ্রেমের আড়ালে কি লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ বিষাদগাথা?

পনেরোটি বসন্ত পার হয়ে গেল। আজও ক্যালেন্ডারের পাতা দুই এপ্রিলে থমকে গেলে স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে ওঠে ওয়াংখেড়ের সেই মায়াবী রাত। গ্যালারি ভর্তি উন্মাতাল জনসমুদ্র আর মহেন্দ্র সিং ধোনির ব্যাটের সেই রাজকীয় হেলিকপ্টার শট – যা আছড়ে পড়েছিল ইতিহাসের পাতায়। ভারতের দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের সেই মহিমান্বিত ছবি আজও কোটি প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু সেই সোনালী ফ্রেমের আড়ালে কি লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ বিষাদগাথা?

ভারতীয় ক্রিকেটের সেই স্বর্ণালি সাফল্যের পর্দাই যেন ঢেকে দিয়েছিল এক অন্ধকার অধ্যায়কে। মাঠের ভেতরে যখন উৎসবের দামামা, ড্রেসিংরুমের অন্দরে তখন ঘনীভূত হচ্ছিল এক অদ্ভুতুড়ে রিক্ততা।

সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের ঠিক পরেই ভারতীয় ক্রিকেট মঞ্চ থেকে একে একে ঝরে পড়তে শুরু করেন একঝাঁক নক্ষত্র। শচীন টেন্ডুলকার, বীরেন্দ্র শেবাগ, জহির খান, গৌতম গম্ভীর, হরভজন সিং – বিশ্বজয়ী সেই দুর্ভেদ্য একাদশের স্তম্ভরা এরপর আর কখনোই বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতের জার্সি গায়ে নামার সুযোগ পাননি।

​টেন্ডুলকারের বিদায় ছিল সময়ের দাবি, কিন্তু বাকিদের প্রস্থানলিপি কি স্বাভাবিক ছিল? নাকি তাঁদের অজান্তেই যবনিকা টেনে দেওয়া হয়েছিল? দুই বছর পর ২০১৩ সালে ভারত যখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতে আইসিসি শিরোপার হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে, তখন ২০১১ সালের ফাইনাল একাদশের মাত্র তিনজন – ধোনি, কোহলি আর রায়না টিকে ছিলেন। বাকিরা যেন এক লহমায় হারিয়ে গিয়েছিলেন বিস্মৃতির অতলে।

এই আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে ধোনির দিকেই বারবার অভিযোগের আঙুল তুলেছেন তাঁর একসময়ের সতীর্থরা। বিশেষ করে গৌতম গম্ভীর, যিনি এখন ভারতের প্রধান কোচ হিসেবে সাফল্যের শিখরে, তিনি কখনও গোপন করেননি তাঁর দহন। ২০১১ সালের ফাইনালে যখন টপ অর্ডার বিধ্বস্ত, তখন গম্ভীরের সেই অকুতোভয় ৯৭ রানের ইনিংসটিই ছিল জয়ের মূল স্থপতি।

শেবাগ বা হরভজনের মতো তারকারাও বারবার বলেছেন, তাঁদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারুণ্যের দোহাই দিয়ে তাঁদের বাতিলের খাতায় ফেলা হয়েছিল। সেই সময়ে ধোনির আড়ালে ছিল তৎকালীন বিসিসিআই প্রধান এন শ্রীনিবাসনের অমোঘ সমর্থন। সিএসকের মালিক এবং বোর্ড প্রধানের সেই সীমাহীন প্রশ্রয় ধোনিকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী করেছিল।

সময় এগিয়েছে, এগিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটও। তবে ইতিহাসের কিছু বিশেষ দিন আজও সেই পুরনো ক্ষতগুলোকে খুঁচিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, ভারতীয় ক্রিকেটের আজকের এই আলোকোজ্জ্বল পথটি সবসময় এত কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এর পরতে পরতে মিশে আছে কিছু অপ্রাপ্তি আর নীরব বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link