গ্যালারির গর্জনহীন এক নি:সঙ্গ লড়াকু যোদ্ধা

আইপিএলের সেই রঙিন মঞ্চে ঝলমলে আলোর নিচে থেকেও যিনি ছিলেন ছায়াবৃত্তের নায়ক, তিনি রজত ভাটিয়া। তথাকথিত মহাতারকাদের ভিড়ে তিনি ছিলেন অনেকটা নি:শব্দ বিপ্লবের মতো।

ক্রিকেটের মায়াবী নন্দনকাননে সবাই যখন গগনচুম্বী ছক্কা আর গতির ঝড়ে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই কিছু শিল্পী থাকেন যারা নিভৃতে বুনে যান জয়ের কারুকাজ। আইপিএলের সেই রঙিন মঞ্চে ঝলমলে আলোর নিচে থেকেও যিনি ছিলেন ছায়াবৃত্তের নায়ক, তিনি রজত ভাটিয়া। তথাকথিত মহাতারকাদের ভিড়ে তিনি ছিলেন অনেকটা নি:শব্দ বিপ্লবের মতো।

২০০৮ থেকে ২০১৭ – আইপিএলের মহাকাব্যের এক দশকে রজত ছিলেন এক অবিনশ্বর নাম। যখন চারদিকে পেশিবহুল বোলারদের দাপট, তখন তিনি আসতেন খুব শান্ত পায়ে। তার হাতের কবজির মোচড়ে বল যেন কথা বলত। ডানহাতি মিডিয়াম পেসের সেই মায়াজালে তিনি ব্যাটারদের বন্দি করতেন পরম মমতায়। তার বোলিং দর্শন ছিল অনেকটা স্থিতধী শিকারির মতো – ‘ইউ মিস, আই হিট’।

​৭১টি উইকেট শিকার করে তিনি কেবল পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ করেননি, বরং ৭.৩৩ এর ঈর্ষণীয় ইকোনমি রেটে বেঁধে রেখেছিলেন প্রতিপক্ষের রানের চাকা। স্লোয়ার বলের সেই সূক্ষ্ম কারুকার্য আর টাইট লাইন-লেংথের বুননে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাঝের ওভারগুলোর এক দু:সহ ধাঁধা।

আইপিএল হয়তো তাকে বোলিংয়ের ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছিল, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটের আঙিনায় তিনি ছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রান এবং পঞ্চাশ এর কাছাকাছি গড় তাকে বসিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। লিস্ট-এ ক্রিকেটেও তার ব্যাটে ছিল রানের ফোয়ারা।

​তবে তার সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি সম্ভবত ক্রিকেটের ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারকে তিনবার পরাস্ত করার সেই বিরল কীর্তি। ২০১২ সালে কলকাতার আকাশ যখন বেগুনি-সোনালি আবিরে রঙিন হয়েছিল, সেই রাজকীয় জয়েও ছিল এই দিল্লির ছেলের নেপথ্য অবদান। রাজস্থান, দিল্লি কিংবা পুনের জার্সি গায়েও তিনি ছড়িয়েছেন সমান সৌরভ।

ভাগ্যের পরিহাসে হয়তো জাতীয় দলের নীল জার্সির স্পর্শ তার পাওয়া হয়নি। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রাথমিক তালিকায় নাম উঠলেও, নিয়তি তাকে চূড়ান্ত দলে ঠাঁই দেয়নি। কিন্তু রজত ভাটিয়া আক্ষেপের বালুচরে ঘর বাঁধেননি। অবসর পরবর্তী জীবনে তিনি মগ্ন হয়েছেন বায়োমেকানিক্স নিয়ে।

সময়ের বালুকাবেলায় কত নামই তো ধুয়ে মুছে যায়, কিন্তু কিছু পদচিহ্ন রয়ে যায় অমলিন। রজত ভাটিয়া ছিলেন আইপিএলের সেই রঙিন ক্যানভাসে এক পরিমিত জলরঙের টান – যার কোনো আস্ফালন ছিল না, অথচ যার অনুপস্থিতিতে পুরো ছবিটাই ছিল অসম্পূর্ণ। গ্ল্যামারের ঝকঝকে রোদে তিনি হয়তো পুড়ে ছাই হতে চাননি, বরং মায়ার চাদর হয়ে আগলে রেখেছেন দলের মাঝের ওভারগুলো।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link