ফুটবলের শাশ্বত নিয়মে রাজকীয় পদাঘাত

সেদিন ভায়াদোলিদের সবুজ ঘাস সাক্ষী হয়েছিল এক নজিরবিহীন ঔদ্ধত্যের, যেখানে মাঠের নিয়মকে হার মানিয়েছিল রাজকীয় দম্ভ।

ফুটবল স্রেফ চব্বিশজন মানুষের পায়ের কারিকুরি নয়। এটি কখনো কখনো হয়ে ওঠে এক জীবনদর্শন, কখনো আবার এক বিশাল ট্র্যাজেডির মঞ্চ। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কতই না বীরত্বগাথা লেখা হয়েছে সোনালী হরফে, কিন্তু ১৯৮২ সালের স্পেনের সেই সন্ধ্যাটি ছিল একদম ভিন্ন। সেদিন ভায়াদোলিদের সবুজ ঘাস সাক্ষী হয়েছিল এক নজিরবিহীন ঔদ্ধত্যের, যেখানে মাঠের নিয়মকে হার মানিয়েছিল রাজকীয় দম্ভ।

আশির দশকের সেই সূচনালগ্নে কুয়েতের ফুটবল ছিল এক তপ্ত মরুঝড়ের মতো। প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চের নীল দিগন্তে পা রেখেছিল পারস্য উপসাগরের এই ছোট দেশটি। চেকোস্লোভাকিয়ার মতো পরাশক্তির বিপক্ষে ড্র করে তারা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, বালুকণার দেশ থেকেও স্বপ্নের ফিনিক্স পাখি উড়তে পারে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল ফরাসি শিল্পীদের এক অপরাজেয় দল।

খেলার ঘড়ি তখন ৭৯ মিনিটের কাঁটায়। মাঠের দখল ততক্ষণে ফরাসিদের জাদুকরী পায়ে। মিডফিল্ডার আলঁ জিরেস যখন বল নিয়ে কুয়েতের রক্ষণব্যুহ চিরে গোলবক্সের জালে বল জড়ালেন, গ্যালারিতে তখন উল্লাসের সমুদ্র। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কুয়েতের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন।

এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করল তাদের। তাদের দাবি ছিল – গ্যালারি থেকে আসা এক রহস্যময় বাঁশির শব্দে তারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, ভেবেছিলেন বুঝি রেফারি খেলা থামানোর সংকেত দিয়েছেন। সেই বাঁশিটি ছিল এক বিজাতীয় সুরের মতো, যা ফুটবলের ব্যাকরণ মেনে বাজেনি, বেজেছিল কোনো এক অজ্ঞাত দর্শকের উন্মাদনায়। কিন্তু সেই একটি শব্দই জন্ম দিল এক মহাপ্রলয়ের।

​মাঠের উত্তাপ যখন সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ঘটল সেই দৃশ্য। যা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। গ্যালারির ভিআইপি আসন থেকে নেমে এলেন কুয়েত ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান এবং রাজপরিবারের প্রতাপশালী সদস্য প্রিন্স ফাহাদ।

​রেফারি মিরোস্লাভ স্তুপারের চোখের দিকে তাকিয়ে যুবরাজ যেন এক অলিখিত ফরমান জারি করলেন। গোল বাতিল না করলে দল নিয়ে মাঠ ছাড়ার সেই হুমকি ছিল ফুটবলের আত্মার ওপর এক পদাঘাত। ক্ষমতার সেই প্রচণ্ড দাপটের সামনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল স্পেনের আকাশ।

​সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটল তখন, যখন ন্যায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো রেফারি স্তুপার সেই রাজকীয় হুমকিতে মাথা নত করলেন। জিরেসের করা সেই শৈল্পিক গোলটি বাতিল হয়ে গেল মুহূর্তেই। ফুটবল হেরে গেল রাজনীতির কাছে, নিয়ম হেরে গেল রক্তের দম্ভের কাছে।

তবে মহাকালের আদালত কাউকে ক্ষমা করে না। সেই এক মুহূর্তের মেরুদণ্ডহীনতা রেফারি স্তুপারকে আজীবনের জন্য ফুটবল থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিল। আর কুয়েত? সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যার পর থেকে গত চার দশকেও তারা আর কখনও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরার টিকিট পায়নি। যুবরাজ শেখ ফাহাদ সেদিন হয়তো একটি গোল মুছে দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু সময়ের পাতায় কুয়েতের জন্য লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন এক দীর্ঘ বিরহের আখ্যান।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link