অনিশ্চয়তাই ফুটবলের সৌন্দর্য, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা যখন স্রেফ পকেটের এক টুকরো নিস্প্রাণ মুদ্রায় বন্দি হয়, তখন তা হয়ে ওঠে এক পৈশাচিক প্রহসন। আধুনিক ফুটবলে পেনাল্টি শ্যুটআউট মানেই এক পরম উৎকণ্ঠা, এক চরম দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু এই শ্বাসরুদ্ধকর প্রথাটির জন্ম হয়েছিল ভাগ্যের এক অদ্ভুত পরিহাস থেকে। আজ আমরা যে ১১ গজের স্নায়ুযুদ্ধ দেখি, তার নেপথ্যে ছিল টস আর লটারির মতো নিষ্ঠুর প্রথা ভাঙার এক ঐতিহাসিক জেদ।
ষাটের দশক পর্যন্ত ফুটবলের নকআউট ম্যাচে ড্র মানেই ছিল ভাগ্যের হাতে সোপর্দ হওয়া। ১৯৬৮ সালের ইউরোতে কেবল কয়েন টসের ভাগ্যে জিতে ফাইনালে যায় ইতালি। ওই বছরই অলিম্পিকে লটারির চিরকুটে নির্ধারিত হয় ইসরায়েলের পরাজয়। ভাগ্যের এই অন্ধ বিচার মেনে নিতে পারেননি ইসরায়েলি ফুটবল কর্তা ইয়োসেফ দাগান ও মাইকেল আলমোগ।
১৯৬৯ সালে তারা ফিফার কাছে প্রস্তাব পাঠান – ম্যাচ নিষ্পত্তি হোক দক্ষতার ভিত্তিতে, অর্থাৎ পেনাল্টি কিকের মাধ্যমে। তাদের মতে, টসের মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারণ ছিল যেমন অনৈতিক, তেমনি অমর্যাদাকর। ১৯৭০ সালের জুন মাসে ফুটবলের আইনপ্রণেতা সংস্থা ‘আইএফএবি’ এই বৈপ্লবিক প্রস্তাবকে আইনি স্বীকৃতি দেয়।

১৯৭০ সালের ৫ আগস্ট। ইংল্যান্ডের হাল শহরের বুদফেরি পার্কে ইতিহাস নতুন করে লেখা হতে যাচ্ছিল। ওয়াটনি কাপের এক ম্যাচে মুখোমুখি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও হাল সিটি। অতিরিক্ত সময়ের শেষেও যখন খেলার ফলাফল ১-১, তখনই রেফারি বাজালেন ইতিহাসের প্রথম অফিশিয়াল পেনাল্টি শ্যুটআউটের বাঁশি।
ইতিহাসের প্রথম শ্যুটআউট কিকটি নিতে আসেন কিংবদন্তি জর্জ বেস্ট। জালে বল জড়িয়ে তিনি হলেন প্রথম গোলদাতা। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। বিশ্বসেরা ডেনিস ল যখন কিক নিলেন, হাল সিটির গোলরক্ষক ইয়ান ম্যাককেকনি তা রুখে দিলেন। ডেনিস ল হলেন ইতিহাসে পেনাল্টি মিস করা প্রথম অভাগা, আর ম্যাককেকনি প্রথম রক্ষাকর্তা।
সেই রাতের পর থেকে পেনাল্টি শ্যুটআউট হয়ে উঠেছে ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবশেষ ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়েছে এই ১১ গজের বিন্দুতেই। ১৯৭৬ সালে আন্তোনিন পানেনকা তার বিখ্যাত চিপ শটের মাধ্যমে এই যন্ত্রণার খেলায় এনেছিলেন শিল্পের ছোঁয়া।

আজও যখন কোনো খেলোয়াড় বুকভরা আশা নিয়ে শট নিতে এগিয়ে যান, তার কাঁধে ভর করে থাকে কোটি ভক্তের স্বপ্ন আর ইতিহাসের কয়েক দশকের অদৃশ্য এক ভার। বুদফেরি পার্কের সেই রাতটি না থাকলে ফুটবল হয়তো আজও পকেটের মুদ্রার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকত। শ্যুটআউট নিষ্ঠুর ঠিকই, কিন্তু এই নিষ্ঠুরতাই ফুটবলকে দিয়েছে এক অনন্য রাজকীয় মর্যাদা।











