‘গর্ডন গ্রিনিজের উত্তরসূরি কে হবেন?’—২০০০ সালের শুরুতে ঢাকার ক্রিকেট অঙ্গনে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। আলোচনায় ছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কয়েকজন কোচ। তবে সেই তালিকার একেবারে ওপরের দিকে ছিল একটি নাম—এডি বারলো। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান অলরাউন্ডার এডি বারলো।
গুঞ্জন সত্যি হল, তিনি দায়িত্ব নিলেন বাংলাদেশের। আর তখন হয়তো কেউই বুঝতে পারেননি, মাত্র দুই বছরের এই সম্পর্ক একদিন পেশাদারিত্বের সীমা ছাড়িয়ে ভালোবাসার গল্প হয়ে উঠবে।
১৯৪০ সালের ১২ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম এডগার জন বারলোর। ক্রিকেট দুনিয়ায় পরিচিত ছিলেন ‘বান্টার’ নামে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলেছেন ৩০টি টেস্ট।

ব্যাট হাতে করেছেন ২ হাজার ৫১৬ রান, গড় ৪৫-এর ওপরে। ছয়টি সেঞ্চুরির সঙ্গে ছিল ১৫টি হাফ সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ ইনিংস ২০১। বল হাতেও ছিলেন সমান কার্যকর—নিয়েছেন ৪০টি উইকেট। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ। ২৮৩ ম্যাচে ১৮ হাজারের বেশি রান, ৪৩টি সেঞ্চুরি এবং ৫৭১ উইকেট বলে দেয়, কেন তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের অলরাউন্ডার।
কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল কোচ হিসেবে তাঁর দর্শন। বাংলাদেশে যখন তিনি এলেন, তখন দেশটির ক্রিকেট দাঁড়িয়ে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছিল, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট তখনও ছিল স্বপ্নের মতো।
বারলো বিশ্বাস করেছিলেন, বাংলাদেশ টেস্ট খেলতে পারে। তারপর এল ২৬ জুন, ২০০০। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন। আইসিসি বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা দিল। এই অর্জনের পথে পর্দার আড়ালের মানুষটি ছিলেন এডি বারলো।

কারও কাছে তিনি ছিলেন বন্ধু, কারও কাছে অভিভাবক, কারও কাছে বাবার মতো একজন মানুষ। তাঁর স্ত্রী কলি বারলোও বাংলাদেশের সঙ্গে এই সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ২০০০ সালেই হঠাৎ স্ট্রোক করে শরীরের এক পাশ অচল হয়ে যায় এডি বারলোর।
হুইলচেয়ারে বন্দী হয়ে পড়েন তিনি। তবুও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থামেনি। অসুস্থ শরীর তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশ তখন তাঁর কাছে শুধুই একটি চাকরির জায়গা নয়, হয়ে উঠেছিল ভালোবাসার একটি দেশ।
এই ভালোবাসার সবচেয়ে আবেগঘন ছবি দেখা যায় ২০০৫ সালে। বাংলাদেশ তখন ইংল্যান্ড সফরে। ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে হুইলচেয়ারে বসে মাঠে এসেছিলেন এডি বারলো। বাংলাদেশের খেলা দেখছিলেন। আর কাঁদছিলেন। চার বছর আগে বাংলাদেশের জন্য কেঁদেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।

চার বছর পর আবারও কাঁদলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে। সেই কান্নার পেছনে ছিল দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশে আসার প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল তাঁর। কিন্তু অসুস্থ শরীর তাঁকে আর সেই সুযোগ দেয়নি। তবুও বাংলাদেশের খেলা দেখার জন্য ডার্বি থেকে ছুটে গিয়েছিলেন লর্ডসে। একজন কোচের জন্য এর চেয়ে বড় ভালোবাসার প্রমাণ আর কী হতে পারে!
তারপর এলো বিদায়ের দিন। ২০০৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর এডি বারলো চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের একজন অকৃত্রিম বন্ধু হারিয়ে গেলেন। প্রিয় নিউল্যান্ডস ক্রিকেট মাঠের পাশেই সমাহিত হলেন তিনি। কিন্তু মানুষের মৃত্যু হয়, ভালোবাসার মৃত্যু হয় না। এডি বারলোর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মাত্র দুই বছরের ছোট্ট এক সম্পর্কেই আজন্ম এক ঋণ রেখে গিয়েছেন তিনি।










