একটি অলিম্পিক ম্যারাথন শেষ হতে সর্বোচ্চ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্রীড়া ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় এমন এক অ্যাথলেটের নাম, যার একটি ম্যারাথন শেষ করতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৫৪ বছর, আট মাস, ছয় দিন, পাঁচ ঘণ্টা, ৩২ মিনিট এবং ২০.৩ সেকেন্ড। আর এই অবিশ্বাস্য গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাপানের প্রথম অলিম্পিয়ান ও কিংবদন্তি দৌড়বিদ শিজো কানাকুরি।
১৯১১ সালের নভেম্বরে জাপানে আয়োজিত ট্রায়াল প্রতিযোগিতায় ৪০ কিলোমিটার ম্যারাথন মাত্র ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে শেষ করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন কানাকুরি। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৯১২ সালের স্টকহোম অলিম্পিকের টিকিট পান তিনি।
কানাকুরির এই ঐতিহাসিক সফরের খরচ জোগাতে জাপানি কলেজ শিক্ষার্থীরা চাঁদা তুলে দেড় হাজার ইয়েন দেয় এবং তাঁর ভাই অবশিষ্ট অর্থের সংস্থান করেন। তৎকালীন সময়ে টোকিও থেকে স্টকহোম পৌঁছানো মোটেই সহজ ছিল না। জাহাজে চড়ে এবং বিখ্যাত ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়েতে চেপে টানা ১৮ দিনের এক ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে সুইডেনে পা রাখেন তিনি।

কিন্তু অনভ্যস্ত খাবার, তীব্র অনিদ্রা এবং ম্যারাথনের দিনের ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের অসহ্য তাপদাহে তিনি মারাত্মক পানিশূন্যতায় ভোগেন। দৌড়ের ১৬তম মাইলে মাথা ঘুরে পড়লে এক সুইডিশ পরিবার তাঁকে সেবা দিয়ে জুস খাইয়ে শুইয়ে দেয়। ক্লান্ত কানাকুরি সেখানে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েন। পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙে, ততক্ষণে অলিম্পিক শেষ!
জাপানের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে অলিম্পিকে এমন ভরাডুবির চরম লজ্জা এবং কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে শিজো কানাকুরি কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে জাহাজে চড়ে দেশে ফিরে যান। অন্যদিকে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর কোনো ফিনিশিং বা সরে দাঁড়ানোর রেকর্ড না পেয়ে তাঁকে অফিশিয়ালি নিখোঁজ হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেয়।
সুইডেনের চোখে কানাকুরি হারিয়ে গেলেও নিজ দেশে ফিরে তিনি অলিম্পিকের গল্প থামতে দেননি। গ্লানি মুছে পরবর্তীতে ১৯২০ অ্যান্টওয়ার্প ও ১৯২৪ প্যারিস অলিম্পিকে তিনি অংশ নেন।

এছাড়া জাপানে দূরপাল্লার দৌড় জনপ্রিয় করতে নারী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দেন এবং দেশটির বিখ্যাত ‘হাকোনে একিডেন’ রিলে রেসের প্রবর্তন করেন। জাপানি ক্রীড়াজগতে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে “জাপানি ম্যারাথনের জনক” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অথচ সুইডেনের খাতায় তিনি তখনও টানা ৫০ বছর ধরে একজন রহস্যময় নিখোঁজ ব্যক্তি!
১৯৬৭ সালে সুইডিশ টিভি জানতে পারে তিনি জীবিত আছেন। ৭৫ বছর বয়সে তাঁকে স্টকহোমে ফিরিয়ে এনে অসমাপ্ত রেস শেষ করানো হয়। স্যুট-প্যান্ট পরে ফিনিশ লাইন পার করার পর ধারাভাষ্যকার বলেন, ‘অবশেষে ১৯১২ অলিম্পিকের সমাপ্তি ঘটলো!’
মুচকি হেসে কানাকুরি বলেন, ‘বড্ড দীর্ঘ সফর ছিল! এই রেসের ফাঁকেই আমি বিয়ে করেছি, ছয়টি সন্তান আর দশটি নাতি-নাতনি পেয়েছি!’












