তিনি ছিলেন এক জলজ্যান্ত সাইক্লোন, যার পায়ে গতি আর বল মিলেমিশে হয়ে উঠত কাব্য। সবুজ গালিচায় গতি, শক্তি আর বল পায়ের জাদুতে রোনালদো লুইস নাজারিও দে লিমা তুলেছিলেন এমন এক তাণ্ডব, যা বিশ্ব ফুটবলে আর কখনো দেখা যায়নি। সমর্থকরা বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে তাঁকে নাম দিয়েছিলেন ‘এল ফেনোমেনো’, মহাজাগতিক এক বিস্ময়।
রিও ডি জেনিরোর বেন্টো রিবেইরো থেকে উঠে এসে ক্রুজেইরোতে তিনি নিজের উপস্থিতি জানান দেন। এরপর পিএসভি আইন্দহোভেন হয়ে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েই বিশ্ব ফুটবলের মূল মঞ্চে ঝড় তোলেন।
১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে চার-পাঁচজন ডিফেন্ডারকে অনায়াসে পরাস্ত করে তাঁর দেওয়া গোলগুলো ফুটবলকে বিশুদ্ধ শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। মাত্র ২১ বছর বয়সে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে জেতেন ব্যালন ডি’অর। ইন্টার মিলান ও পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদের গ্যালাকটিকো যুগে তাঁর পায়ের নিখুঁত কারুকাজ কেবল পরিসংখ্যান বাড়ায়নি, স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শককে বাধ্য করেছে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে।

রোনালদোর মহাকাব্য কেবল ট্রফি আর উদযাপনে আঁকা নয়। এর অর্ধেকেরও বেশি জুড়ে রয়েছে নিয়তির দেওয়া নিষ্ঠুর যন্ত্রণা। ২০০০ সালে ইন্টার মিলানের হয়ে খেলার সময় হাঁটুর লিগামেন্ট যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, চিকিৎসকরা ফুটবল ছেড়েই দিতে বলেছিলেন। টানা দুই বছর মাঠের বাইরে, একাধিক অস্ত্রোপচার আর মানুষের সংশয় – সবাই যখন ধরে নিয়েছিল এই নক্ষত্রের পতন ঘটে গেছে, তখনই ঘটে ইতিহাসের এক অলৌকিক পুনরুত্থান।
১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই রহস্যময় অসুস্থতার ট্র্যাজেডি ধুয়ে-মুছে ২০০২ এর ইয়োকোহামার রাতে ব্রাজিলকে এনে দেন পেন্টা বিশ্বকাপ। মাথার সেই বিস্ময়কর হেয়ারস্টাইল নিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে আটটি গোল করেন। বিশেষ করে ফাইনালে জার্মানির ওলিভার কানকে পরাস্ত করে জোড়া গোল করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন – প্রকৃত বীররা ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকেও ডানা মেলতে জানে
দুইবার বিশ্বকাপ জয়, তিনবার ফিফা বর্ষসেরা খেতাব, দুইটি ব্যালন ডি’অর এবং বিশ্বকাপে তৎকালীন সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৫টি গোল – পরিসংখ্যানের খাতায় তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। এছাড়া ক্রুজেইরো, পিএসভি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ ও এসি মিলানের মতো পরাশক্তিদের হয়ে তিনি ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন।

ঘন ঘন মারাত্মক ইনজুরি যদি তাঁর শরীরে থাবা না বসাত, তবে রোনালদো নাজারিওর ক্যারিয়ার হয়তো ফুটবল আকাশের আরও অনেক উঁচুতে গিয়ে ঠেকত। কিন্তু শুধুই কি পরিসংখ্যান দিয়ে ফেনোমেনোর মাহাত্ম্য মাপা সম্ভব? বল পায়ে তিনি যখন ঝড়ের গতিতে ছুটতেন, তখন প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরত, আর পুরো পৃথিবী থমকে যেত এক অদ্ভুত জাদুকরী মোহে। তিনি স্রেফ একজন স্ট্রাইকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন নান্দনিক ফুটবলের এক অমলিন প্রতীক।











