২০০৮ সাল। পার্থে তখন রিকি পন্টিংদের মতো বিশ্বসেরা অজি ব্যাটাররা ক্রিজে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করছেন এক দীর্ঘকায় ভারতীয় বোলারের বাউন্সারের কাছে। হ্যাঁ, বলছি গতির ঝড়ে ২২ গজে অসাধারণ সব স্পেল উপহার দিয়ে বাঘা বাঘা ব্যাটারদের নাজেহাল করা ভারতীয় পেসার ইশান্ত শর্মার কথা!
২০০৭ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে অভিষেক ঘটে ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির ইশান্তের। জাভাগাল শ্রীনাথের মতো দীর্ঘদেহী এই তরুণ প্রথাগত সুইংয়ের চেয়ে পিচে বল জোরে ডেলিভারি করতে পছন্দ করতেন। ২০০৮ সালের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে সিবি সিরিজে ভারতকে জয় এনে দেন এই পেসার। সেখানে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪টি উইকেট শিকার করেন ইশান্ত।
কিন্তু দিনের মধ্যভাগে আকাশে আলো আর উত্তাপ ছড়াতে থাকা সূর্যকেও কখনো কখনো কালো মেঘ ঢেকে দেয় অপ্রত্যাশিতভাবে। ইশান্ত শর্মার ক্যারিয়ারেও ঠিক সেটাই ঘটে! সিনিয়র টেস্ট ক্রিকেটে দুর্দান্ত সূচনার কয়েকদিনের মাথায়ই ইশান্ত সিমের খেই হারিয়ে ফেলেন। বল ছাড়ার সময় কবজির ত্রুটিপূর্ণ মুভমেন্ট আর অতিরিক্ত ক্রস-সিম ডেলিভারির কারণে তাঁর লাইন-লেন্থ সব গুলিয়ে যেতে থাকে!

বিসিসিআইয়ের নির্বাচকরা তাই কাজের চাপ কমিয়ে তাঁকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। ২০১২ সালে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়ে অস্ত্রোপচার করানোর পর আরও ফর্মহীনতায় ভুগতে থাকেন তিনি। দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে কাটিয়ে ২০১৩ সালে যখন ইশান্ত নিজের ৫০তম টেস্ট খেলার সুযোগ পান, তখন তাঁর বোলিং গড় ছিল বাজেদের কাতারে, প্রথম ৭০ টেস্ট শেষে যা ছিল ৩৭.০৫।
এই যখন পরিস্থিতি, ঠিক তখনই মাঠে নিজেকে শুধরে ক্রিকেট বোদ্ধাদের সমালোচনার জবাব দেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন ইশান্ত শর্মা। নিজেকে নতুন ছাঁচে গড়ে তুলে বদলে ফেলেন বোলিং লেন্থ। বল রিলিজের সময় কবজিকে সঠিকভাবে ঘুরানোর কৌশলও নতুন করে রপ্ত করেন তিনি। সঙ্গে যোগ হয় তাঁর অনবদ্য সুইং আর লেগ-কাটার ডেলিভারি দেওয়ার প্রবণতা। একইভাবে, গতি না হারিয়েই টানা দীর্ঘ স্পেলে খেলার দৃঢ় মানসিকতা ও শারীরিক শক্তি তাঁকে অনন্য করে তোলে ২২ গজে।
এই পরিবর্তনের ফল মেলে হাতেনাতেই। ২০১৪ সালে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নয় উইকেট নেওয়ার পর, একই বছরের লর্ডস টেস্টে মাহেন্দ্র সিং ধোনির পরামর্শে শর্ট বলের তাণ্ডব চালিয়ে তিনি একাই ধসিয়ে দেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। ৭৪ রানে ক্যারিয়ার সেরা সাত উইকেট শিকার করে থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে ভারতকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন ইশান্ত।

ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার মাটিতেও। এসএসসি টেস্টে আট উইকেট তুলে তিনি সাদা পোশাকে ম্যান ইন ব্লুজদের হয়ে ২০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন। তবে, একদিনের ক্রিকেটে তাঁর আক্ষেপ বাড়িয়ে দেয় হাঁটুর চোট। ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপটাই মিস করেন তিনি ইনজুরির কারণে। বিশ্বকাপ শেষ না হতেই ২০১৬ সালের ওয়ানডে ফরম্যাটকে বিদায় জানান এই ফাস্ট বোলার।
তাঁর এই সিদ্ধান্ত শাপে বর হয়ে ওঠে ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০১৯ সাল তাঁকে টেস্ট ক্যারিয়ারের চূড়ায় নিয়ে যায়। আবারও ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে তিনি শিকার করেন ১৮ উইকেট। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যথাক্রমে আট ও ১১ উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে অজিদের ডেরায় ভারত ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় সেবার।
কপিল দেবের পর মাত্র দ্বিতীয় ভারতীয় পেসার হিসেবে শতাধিক টেস্ট ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েন ইশান্ত, নেন ৩১১টি উইকেট। আর ওয়ানডেতে ৮০ ম্যাচে ১১৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। তবে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা কখনোই তাঁর নিজের ফরম্যাট হয়ে ওঠেনি। ১৪ টি-টোয়েন্টি খেলে মোটে আট উইকেট পান তিনি। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গণকে বিদায় জানান ১৯৮৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে জন্মানো এই গতিদানব।

সবকিছু ছাপিয়ে ক্যারিয়ারে দুর্দান্ত সূচনার পর ফর্ম হারিয়ে ফের পরিশ্রম আর ধৈর্যের শক্তিতে অনবদ্য কামব্যাক করা চাট্টিখানি কথা নয়! তাই জহির খানের যুগ থেকে এখনকার প্রজন্মের সকল ঘরানার ভারতীয় পেসারদের কাছে অধ্যবসায়ের এক চিরন্তন মহাকাব্যই হয়ে থাকবে ইশান্ত শর্মার নাম!










