বিশ্বকাপের জন্য সদাপ্রস্তুত

ক্লাব ফুটবলে ফর্মহীনতার ধাক্কা সামলে হয়ত ক্লোসা নিজের কারিকুরির সবটা রেখে দিতেন বিশ্বমঞ্চে উগড়ে দেওয়ার জন্য। তাই বোদ্ধাদের অনেকেই বলে থাকেন: “হি ওয়াজ নাথিং, উইদাউট দ্য ওয়ার্ল্ডকাপস—অর, হি ওয়াজ দেয়ার অলওয়েজ ফর দ্য ওয়ার্ল্ডকাপস!”

ফুটবলপ্রেমীরা সবসময়ই চান চোখধাঁধানো গতি আর নজর কাড়া ড্রিবলিংয়ের জাদুতে মাতোয়ারা হতে, চান মাস্টারক্লাস ফিনিশিং আর নান্দনিক ফুটবলের সাক্ষী হতে। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ের জন্যই কথাটা সত্যি। কিন্তু ফুটবলের একজন প্রিন্স ছিলেন, যিনি ক্লাব ফুটবলে এসবের কিছুই করতেন না। জাতীয় দলের জার্সিতেও মোটামুটি গড়পড়তাভাবেই খেলতেন।

শুধু ব্যতিক্রমটা চোখে পড়ত কেবল বিশ্বকাপ এলেই! কোনো অভিনব ট্যাকটিক্যাল এক্সিবিশন ছাড়াই তিনি বিশ্বকাপের আসরগুলোতে গোল করে যেতেন দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে। নাম তাঁর মিরোস্লাভ জোসেফ ক্লোসা!

ছয় ফুট উচ্চতার এই সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড কখনো গায়ে কোনো রঙিন ট্যাটু করাননি, ছিল না তাঁর তেমন গ্ল্যামারাস চেহারাও। তবুও এই সাধারণ মানুষটাই জার্মানির ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি গায়ে জড়িয়ে যখনই বিশ্বমঞ্চে নামতেন, তখনই হয়ে উঠতেন স্ব মহিমায় ভাস্বর।

ক্লাব ফুটবলে ক্লোসার যাত্রাটা অতটা ধারাবাহিক ও সুখকর ছিল না। কাইজারস্লাউটার্ন থেকে শুরু করে বায়ার্ন মিউনিখ—সবখানেই তিনি নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকারের দায়িত্ব পালনের ভার পেলেও বারবার ফর্মহীনতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে।

২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বুন্দেসলিগার ক্লাব ভার্ডার ব্রেমেনে খেলে ৮৯ ম্যাচে ৫৩ গোল করেন ক্লোসা। ২০০৬ সালে লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জেতেন তিনি। এই অধ্যায়টাই তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময়।

পরের চার বছর জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখে কাটালেও, ক্লাবটিতে দীর্ঘদিন গোলখরাই সঙ্গী ছিল তাঁর। পরবর্তীতে ইতালির ক্লাব লাৎসিওতে পাড়ি জমিয়েও গোল শিকারে খুব একটা নিয়মিত হতে পারেননি তিনি। এর বাইরে, জার্মানির হয়ে তিনটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে ১৪ ম্যাচে মোটে তিন গোল করেন এই স্ট্রাইকার।

অথচ, অনিয়মিত পারফর্ম করা এই ক্লোসাই বিশ্বকাপ এলে যেন অলিম্পাসের দেবতার জাদুকরী স্পর্শে জেগে উঠতেন। তাঁর রক্তে সচল হয়ে উঠত ৯০ মিনিট ধরে লড়ে যাওয়ার অদম্য জার্মান জেদ। ফলে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ ডি-বক্সের ভেতরে নিখুঁত টাইমিং, অসাধারণ গতিবদল আর নিখুঁত ট্যাপ-ইনে বল জালে জড়ানো যেন নিছক ‘ডাল ভাত’ হয়ে যেত এই ফরোয়ার্ডের কাছে।

আদতে, ক্লোসার খেলার ধরন প্রথাগত নম্বর নাইন স্ট্রাইকারের মতো হলেও বাতাসে ভেসে হেডিং করার দক্ষতায় তিনি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের একজন হয়ে ওঠেন। ২০০২ সালের অভিষেক বিশ্বকাপেই পাঁচটি চমৎকার হেডারে লক্ষ্যভেদ করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি।

এখানেই শেষ নয়! ২০০২, ২০০৬, ২০১০ আর ২০১৪ বিশ্বকাপে মোট ২৪ ম্যাচ খেলে ১৬ গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসা বনে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। সত্যিই,  ক্লাব ফুটবলে ফর্মহীনতার ধাক্কা সামলে হয়ত ক্লোসা নিজের কারিকুরির সবটা রেখে দিতেন বিশ্বমঞ্চে উগড়ে দেওয়ার জন্য।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link