ক্রিকেট দুনিয়ায় স্পিনার তো বহু আছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে প্রথাবিরুদ্ধ হতে পারেন কজন? কিংবা হাতের আঙুলের ভেলকি আর ক্ষুরধার বুদ্ধিতে স্পিন বোলিংয়ের ব্যাকরণটাই বদলে দিতে পারেন কজন? আর কেউ পারুক বা না পারুক — এই জায়গাটায় যিনি শতভাগ সফল, তিনি সাবেক ভারতীয় স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন!
অতীতের দিকে ফ্ল্যাশব্যাক করলেই দেখা যায়, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অশ্বিন ছিলেন এক অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতার প্রতীক। নিজের অভিষেক টেস্টেই নয় উইকেট নিয়ে জিতেছিলেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। এরপর সাদা পোশাকের অভিজাত ক্রিকেটে তিনি কোনোকিছুরই তোয়াক্কা না করে স্রেফ ছুঁয়ে গেছেন মাইলফলকের পর মাইলফলক! দ্রুততম ৫০, ১০০, ২৫০, ৩০০ ও ৩৫০ উইকেট শিকারের অনন্য রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছেন ১৯৮৬ সালে চেন্নাইয়ে জন্মানো এই তারকা।
মোটে ৯৮ টেস্ট খেলে ৫০০ উইকেট লুফে নেওয়ার অবিশ্বাস্য নজিরও গড়েন অশ্বিন। বিশ্ব ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়ায় তাঁর চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল লঙ্কান কিংবদন্তি মুত্তিয়া মুরালিধরন।

তবে স্রেফ উইকেটের খটমট সংখ্যা দিয়ে অশ্বিনের ক্যারিয়ারকে পরখ করলে অলিম্পাসের দেবতা হয়ত একটু নারাজই রয়ে যাবেন! বাইশ গজের ভেতরে খেলার গতিপ্রকৃতি নিভৃতে পড়ে ফেলতে তিনি যে অসামান্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতেন, সেটাও বা কজনই পারেন?
সঙ্গে ফ্লেক্সিবল আঙুলের সূক্ষ্ম মোচড়ে তাঁর ডেলিভারি করা নিঁখুত সব ‘সোডুকু’ আর ‘ক্যারম’ বলগুলো যে কতটা ভয়ানক — তা যেসব ব্যাটার খেলেছেন, তাঁরাই শুধু বলতে পারবেন। এর বাইরে, গোল্ডিলক্স জোনে বলের অনবদ্য সব ফ্লাইট, বিভ্রান্তিকর আর্ম বলের পসরা কিংবা ক্রিজের অবস্থান বদলে ব্যাটারদের মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলতেও অশ্বিনের জুড়ি ছিল মেলা ভার!
একইসাথে, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ৯০টির বেশি উইকেট সংগ্রহ কিংবা টেস্টে ৩০ বার ফাইফার পাওয়ার মতো তাঁর অনন্যতার সাক্ষ্য দেয়। টেস্ট ইতিহাসে তাঁর ১১টি ‘প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ’ পুরস্কার জয়ের কীর্তি প্রমাণ করে, একা হাতে পুরো একটা সিরিজের গতিপথ কীভাবে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত অশ্বিনের দুর্দান্ত সব ডেলিভারি!

লাল বলের সঙ্গে সঙ্গে সাদা বলেও সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন এই ম্যান ইন ব্লুজ তারকা। ক্যারিয়ারের সূচনালগ্নে ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এই বোলার। অবশ্য আসরটিতে হরভজন সিং থাকায়, মোটে দুই ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
তবে, ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে নিজেকে ভারতের স্পিন আক্রমণের অন্যতম প্রধান কান্ডারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন অশ্বিন। টুর্নামেন্টটিতে আট ম্যাচে ১৩ উইকেট শিকার করেন তিনি। আসরজুড়েই প্রতিপক্ষের রানের চাকা শ্লথ রাখতে বড় ভূমিকা রাখেন এই স্পিনার।
২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তিনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন দলকে। ৫.৩৫ ইকোনমি রেটে ছয় ম্যাচে ১১ উইকেট পান তিনি। সেবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ওভার দুই বলে মাত্র ১১ রান খরচ করে চার উইকেট তুলে নেন অশ্বিন। তবে, ২০১৬ ও ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তেমন কোনো কারিকুরি দেখাতে পারেননি তিনি।

ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও টেস্টে সবসময়ই উজ্জ্বল ছিলেন অশ্বিন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সময় তাঁর নামের পাশে ছিল ৫৩৭টি টেস্ট উইকেট। ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিও তিনি। পাশাপাশি ব্যাট হাতে ছয়টি টেস্ট শতক আর প্রয়োজনের মুহূর্তে রান তোলার ক্ষমতা তাঁকে নিয়ে গিয়েছে অনন্য উচ্চতায়।
পরিসংখ্যানের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রখর ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা, বোলিংয়ের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও প্রথাবিরুদ্ধ সৃজনশীল কৌশলের জোরে ইতিহাসে সমাদৃত হতে বাধ্য রবিচন্দ্রন অশ্বিন। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তিনি নিছক কোনো বোলার নন। তিনি এমন এক সত্তা, যাঁর আঙুলের মোচড়ে জন্মেছে ক্রিকেটাঙ্গণের এক অনিন্দ্য সুন্দর অধ্যায়!










