পর্তুগালের জার্সিতে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যিনি দলের সবচেয়ে বড় নাম, বুধবার কোপেনহেগেনে সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হঠাৎ ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বৃহস্পতিবার ডেনমার্কের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচ, তার আগের দিন পার্কেন স্টেডিয়ামে অনুশীলনে নামার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু কোচ হোর্হে জেসুসের সংবাদ সম্মেলন শেষ হতেই তিনি স্টেডিয়াম ছাড়লেন দুজন সহকারী স্টাফকে নিয়ে। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল পর্তুগালের গণমাধ্যমে, সঙ্গে খবর এল তাঁর প্রাইভেট জেটও কোপেনহেগেনের দিকে রওনা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেসুস জানিয়ে দিয়েছিলেন, ডেনমার্কের বিপক্ষেও শুরুর একাদশে থাকছেন না রোনালদো। এসি মিলানের স্ট্রাইকার গনসালো রামোসকেই আবার খেলাতে চান তিনি, যিনি নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয়ে জয়সূচক গোলটা করেছিলেন। জেসুস বললেন, “সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে গনসালোই খেলবে।” রোনালদোর কথা উঠতে আরও পরিষ্কার করে বললেন, “আমার দরকার হলে ও নামবে, দরকার না হলে নামবে না।”
গোলমালের শুরুটা আসলে নরওয়ে ম্যাচ থেকেই। ওই ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট বেঞ্চে বসে ছিলেন রোনালদো। জেসুসের দাবি, ম্যাচের আগেই তিনি রোনালদোকে জানিয়ে রেখেছিলেন যে শুরুতে খেলবেন না, তবে শেষ দিকে নামানোর সম্ভাবনা আছে। শেষ পর্যন্ত নামানো হয়নি। কোচ বললেন, “পরে কোচ হিসেবে আমি ঠিক করলাম ওকে নামাব না। এটা নিয়ে হইচই করার মতো কিছু নেই।” অথচ খেলা শেষে রোনালদো সতীর্থদের সঙ্গে গ্যালারির সমর্থকদের অভিবাদন না জানিয়ে সোজা ড্রেসিংরুমে চলে গিয়েছিলেন। জেসুস অবশ্য কোনো ঝামেলার কথা মানতে রাজি নন। তাঁর ভাষ্য, “কোনো ঘটনাই ঘটেনি।” খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাও টানলেন তিনি, “২০ বা ৩০ মিনিট ওয়ার্ম আপ করার পর যদি মাঠেই নামতে না পারো, তাহলে কেউই খুশি হয় না।”

মঙ্গলবার অনুশীলনে রোনালদো নামেননি বলে কিছু গণমাধ্যম লিখেছিল। জেসুস সেটা মানেননি, বলেছেন রোনালদো আলাদাভাবে প্রাকটিস করেছেন, বুধবার স্বাভাবিক অনুশীলনের কথা ছিল, দলের বাসেই স্টেডিয়ামে এসেছিলেন, কিন্তু মাঠে সতীর্থদের সঙ্গে আর যোগ দেননি। ফেডারেশন তখন ছোট একটা বিবৃতিতে শুধু জানিয়েছিল, রোনালদো অনুশীলন করেননি।
এই টুর্নামেন্টে রোনালদোর শুরুটাও ভালো ছিল না। প্রথম ম্যাচে ওয়েলসকে পর্তুগাল ১-০ গোলে হারিয়েছিল, মাঠে নামলেও নিজের মানের খেলা দেখাতে পারেননি তিনি। কোচ আবার নিজের অবস্থান নিয়ে ছিলেন কঠোর। তিনি বলেছেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতা কোচেরই, কোনো ফুটবলার সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে না।” কাকে কতক্ষণ খেলানো হবে, আদৌ খেলানো হবে কি না, সবই কোচের হাতে।
পরিস্থিতি সামলাতে ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েন্সা আজোরেস সফর বাতিল করে ছুটে এসেছিলেন। কোচের সংবাদ সম্মেলনের পর রোনালদোর সঙ্গে কথাও বলেছেন তিনি। এরপরই এল ইনস্টাগ্রামে রোনালদোর পোস্ট। সেখানে তিনি লিখলেন, “জাতীয় দলের কোচের সংবাদ সম্মেলনের পর এবং ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পর আমি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” এরপর যোগ করলেন, “যথাসময়ে আমি সব পর্তুগিজ মানুষকে জানাব, কেন জাতীয় দল ছাড়ছি। এই দলের প্রতি আমি সবসময়ই নিবেদিত ছিলাম। এখন পর্তুগাল আর আমার সব সতীর্থকে, শুভকামনা জানানোর সময়।”

পর্তুগিজ গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে, ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচটাই পর্তুগালের জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ ছিল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা তিনি এখনো দেননি। চলতি আন্তর্জাতিক বিরতিতেই এ নিয়ে তাঁর আরও কথা বলার সম্ভাবনা আছে।
২০০৩ সালে অভিষেকের পর ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা এই সিজনেই বলেছিলেন, এটাই হয়তো তাঁর ফুটবল জীবনের শেষ বছর। কিন্তু দেশের জন্য এত কিছু করা একজন মানুষের বিদায় বেঞ্চ থেকে, ক্যাম্প ছেড়ে, একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ভেতর দিয়ে আসবে, এটা হয়তো তিনি নিজেও চাননি।











