একদিন তিনি ছিলেন ব্যাংকের সাধারণ এক কর্মচারী। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অফিস, ফাইল আর হিসাবের খাতা নিয়েই কেটে যেত সময়। ফুটবল ছিল শুধুই ভালোবাসা, অবসরের শখ। কিন্তু, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই মানুষটিই এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে পড়েছেন। গল্পটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু রবার্তো লোপেসের জীবন আসলেই যেন সিনেমার চিত্রনাট্য।
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা লোপেসের জীবন ছিল একেবারেই সাধারণ। ব্যাংকের চাকরি করতেন, পাশাপাশি স্থানীয় লিগে শখের বশে ফুটবল খেলতেন। তখন কি তিনি কখনও ভেবেছিলেন, জন্মভূমি থেকে তিন হাজার মাইল দূরের একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন? সম্ভবত না।
৩৩ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার নিজেই স্বীকার করেছেন, ব্যাংকের চাকরি তিনি খুব একটা উপভোগ করতেন না। তবু জীবন চলছিল নিজের গতিতেই। ‘পিকো’ নামে পরিচিত লোপেস একসময় মর্টগেজ অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। একই সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের ক্লাব বোহেমিয়ান্সের হয়ে খণ্ডকালীন ফুটবল খেলতেন।
জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০১৭ সালে। ডাবলিনের আরেক ক্লাব শ্যামরক রোভার্স তাকে একটি বড় সুযোগ দেয়। ফুটবলে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব পান তিনি। এক মুহূর্তও দেরি করেননি। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন ফুটবলার হয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে তার সামনে খুলতে থাকে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

তবে সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা ঘটে দুই বছর পর। ২০১৯ সালে হঠাৎই একটি বার্তা আসে তার লিংকডইন অ্যাকাউন্টে। বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন কেপ ভার্দের তৎকালীন কোচ রুই আগুয়াস। তিনি জানতে পেরেছিলেন, পিকো লোপেসের বাবা কার্লোস কেপ ভার্দের নাগরিক। সেই সূত্র ধরেই জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব পাঠানো হয়।
কিন্তু প্রথমবার বার্তাটি পেয়েও কোনো গুরুত্ব দেননি লোপেস। কারণ বার্তাটি ছিল পর্তুগিজ ভাষায় লেখা। ভাষাটি না বোঝায় তিনি সেটিকে স্প্যাম ভেবেছিলেন। তাই উত্তরও দেননি।
মজার ব্যাপার হলো, প্রায় নয় মাস পর আবারও একই কোচ তাঁকে বার্তা পাঠান। জানতে চান, প্রস্তাবটি নিয়ে তিনি ভেবেছেন কি না। তখন কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়েন লোপেস। এতদিন উত্তর না দেওয়ার বিষয়টি তাকে বিব্রত করে। এবার তিনি গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্য নেন।
বার্তাটি অনুবাদ করে বুঝতে পারেন, সত্যিই তাকে কেপ ভার্দের জাতীয় দলে খেলার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যায়। লোপেস পরে বলেছিলেন, বার্তাটি বুঝতে পারার পর তিনি ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দেন, অবশ্যই তিনি কেপ ভার্দের হয়ে খেলতে চান।

এরপর যেন ঝড়ের গতিতে এগিয়েছে তার জীবন। গত সাত বছর ধরে নিয়মিত কেপ ভার্দের জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন তিনি। শুধু খেলাই নয়, দলকে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তুলে আনতেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে সুখবর। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার কিছুদিন পরই প্রথমবার বাবা হন লোপেস। তার স্ত্রী লিয়াহ জন্ম দেন পুত্রসন্তান ডিয়েগোর।
এবার কেপ ভার্দে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমেছে। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ শক্তিশালী স্পেনের সাথে ড্র করেছে, র্যাংকিংয়ের ৬৭ তম দলটা গড়েছে অবিশ্বাস্য ইতিহাস। কিন্তু লোপেসের কাছে এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং বহু বছরের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। ম্যাচে সেন্টার ব্যাক পিকো লোপেস নিজেও দুর্দান্ত খেলেন।
ব্যাংকের ডেস্ক থেকে বিশ্বকাপের মাঠ—রবার্তো লোপেসের যাত্রাটা বদলে দেয় অপ্রত্যাশিত এক লিংকডইন মেসেজের গল্প। যে মেসেজটিকে একদিন তিনি স্প্যাম ভেবেছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে তাঁর পুরো জীবন।











