স্টিভ ওয়াহ’র বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটে যাওয়া ম্যাকগ্রা

‘এই যে স্টিভ ওয়াহর বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটল গ্লেন ম্যাকগ্রা - এই কাহিনী তো বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গ হওয়া উচিৎ। শুধু ওইটা নিয়েই তো একটা উপন্যাস লেখা উচিত। কোথায় আছে? জওহরলাল নেহরুর বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটছেন বল্লভভাই প্যাটেল, বাপের জন্মে হবে না। সম্ভবই না। শুধু স্পোর্টস এটা করতে পারে। আবার বলছি শুধু স্পোর্টসই এটা করতে পারে।’

‘খেলা’র ২২ বছরপূর্তি উপলক্ষে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায় একটি যুগ্ম সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তর। এবং সেই সাক্ষাৎকারটি যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল সেই সময়। সেই সাক্ষাৎকারটিতে একজন বলেছিলেন, ‘এই যে স্টিভ ওয়াহর বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটল গ্লেন ম্যাকগ্রা – এই কাহিনী তো বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গ হওয়া উচিৎ। শুধু ওইটা নিয়েই তো একটা উপন্যাস লেখা উচিত। কোথায় আছে? জওহরলাল নেহরুর বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটছেন বল্লভভাই প্যাটেল, বাপের জন্মে হবে না। সম্ভবই না। শুধু স্পোর্টস এটা করতে পারে। আবার বলছি শুধু স্পোর্টসই এটা করতে পারে।’

ঠিকই ধরেছেন, যিনি এটা বলতে পারেন, তিনিই বলেছিলেন এটা। তাঁর নাম অশোক দাশগুপ্ত। যুগ্মভাবে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সুরজিত সেনগুপ্ত আর গৌতম ভট্টাচার্য।

অস্ট্রেলিয়ার বোলিং উড়ে বেড়াত ১৪ বছর ধরে, ১৯৯৩-২০০৭। তাদের দলে একজন ‘পায়রা’ ছিলেন সে সময়। তাঁর বোলিংয়ের ধার ও নেতৃত্ব তার সময়ে অস্ট্রেলিয়াকে দিয়েছিলো উপর্যুপরি তিনটি বিশ্বকাপ, ১৯৯৯, ২০০৩ আর ২০০৭ সালে। তাঁর বোলিংয়ের নৈপুণ্য এবং ঘাতকশক্তি ১৪ বছরের মত একটা দীর্ঘ সময় ধরে অবশ করে রেখেছিলো বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যাটকে।

তার জন্ম হয়েছিলো নিউ সাউথ ওয়েলসের ডুব্বো শহরে, ১৯৭০। সেখান থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ন্যারোমিন শহরে তার বেড়ে ওঠা, ক্রিকেট খেলা এবং প্রবাদপ্রতিম ডাগ ওয়াল্টার্সের নজরে পড়া। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে, ২৩ বছর বয়সে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে প্রথম খেলা, দ্রুত পাদপ্রদীপের আলোয় আসা ও মাত্র আটটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলার পরেই অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে ঢুকে পড়া। পার্থে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে  প্রথম টেস্ট খেলা, ১৯৯৩ সালের ১২ নভেম্বর এবং দুই ইনিংসে তিন উইকেট পাওয়া, সম্ভাব্য ১৪টির মধ্যে।

তারপরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, কোনদিন। দুই জানুয়ারি ২০০৭ সালে সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টটি ছিল তার ১২৪ তম ও শেষতম টেস্ট। এর মধ্যে তিনি তুলে নিয়েছিলেন ৫৬৩টি টেস্ট উইকেট, ২১.৬৪ গড়ে। ২২.০২ গড়ে ২৫০টি ওয়ানডেতে তাঁর শিকার ছিল ৩৮১টি উইকেট, যা এসেছিলো ৯ নভেম্বর ১৯৯৩ (মেলবোর্ণ, বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা) আর ২৮ এপ্রিল ২০০৭য়ের (কেনসিংটন ওভাল, বনাম শ্রীলঙ্কা) মধ্যে।

নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি করে. মোট দু’টি টি-টোয়েন্টির আন্তর্জাতিক খেলে ২০০৫ সালে তিনি তুলেছেন পাঁচটি উইকেট, ১৫.৮০ গড়ে। ২১.৭৬ গড়ে এই মোট ৯৪৯ টি আন্তর্জাতিক উইকেটের (তিন ফরম্যাটে কোন পেসারের সেরা মোট শিকার) নীরস তথ্য কচকচির মধ্যে যেটা বলা নেই, তা হলো এই যে এর মধ্যে একটি উইকেটও ফাস্ট বোলিংয়ের অযথা আগ্রাসনের ফলশ্রুতি ছিল না, সেগুলি দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বোলিংয়ের শৈল্পিক সম্মোহনে বিবশ, হতমান, পর্যুদস্ত হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানরা।

৮/২৪, ৭/১৫ আর ৩/৩১ – ছিল তার সেরা এক ইনিংসে বোলিং, যথাক্রমে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি, এই তিন ফরম্যাটে। তার ম্যাচ সেরা টেস্ট বোলিং ছিল ১০/২৭। ৩০০ তম উইকেটের মাইলস্টোন তিনি ছুঁয়েছিলেন একটি হ্যাটট্রিক করে, তার ৩০০তম উইকেটের নাম ছিল ব্রায়ান লারা। তিনি ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আর কোন পেসার ১০০-এর বেশি টেস্ট খেলেননি, আজ অবধি। টেস্টে তাঁর ৫৬৩র মধ্যে ১০৪ জন শিকার আউট হয়েছেন শূন্য রানে।

আজও তিনি টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী পেস বোলার, জিমি অ্যান্ডারসনের পরেই। সব মিলিয়ে তিনি আজও টেস্টে পঞ্চম সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার। ২৯ বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট আর ৩বার ম্যাচে ১০ উইকেট আছে তার জিম্মায়।

সাত বার পাঁচ উইকেট আছে ওডিআই-তে।বিশ্বকাপে সেরা উইকেটশিকারী তার চারটি বিশ্বকাপে ৩৯ টি ম্যাচে শিকার সংখ্যা ৭১ (যার কাছাকাছি আছেন ৬৮ টি উইকেটসহ মুত্তিয়া মুরালিধরণ), শুধু ২০০৭ সালেই ছিল ২৬ টি (মিশেল স্টার্কের ২৭ টির পরে দ্বিতীয় সেরা) উইকেট।

২০০৮য়ে মারণ রোগে প্রথম স্ত্রী জেন-য়ের মৃত্যুর পরে ব্রেস্ট ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রশংসনীয় যুদ্ধ শুরু করেন তিনি।এ কাজে তার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি নিশ্চিত করেন যে প্রতি বছর সিডনি টেস্ট ‘গোলাপী টেস্ট’ হিসেবে খেলা হবে এবং ওই টেস্টের তৃতীয় দিন তার প্রয়াত স্ত্রীর জন্য উৎসর্গ করা হবে।

চেন্নাইয়ের এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এখন তিনিই, ডেনিস লিলির উত্তরাধিকারী হিসেবে।মাঝে মধ্যে ধারাবিবরণী দিতেও দেখা যায় তাঁকে। ২০১০ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। পাত্রী ছিলেন সারা লিওনার্দি।

২০০০ সালের অ্যালান বর্ডার ট্রফির প্রাপক ছিলেন তিনিই। ২০০৮ সালে তিনি অর্ডার অফ অস্ট্রেলিয়ার সদস্য হন। ২০১১ সালে স্পোর্ট অস্ট্রেলিয়া হল অফ ফেম আর ২০১৩ সালে আইসিসি হল অফ ফেম সম্মান দেওয়া হয় তাকে। তিনি জায়গা পান সর্বকালের সেরা অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডে দলেও। ২০১৭ সালে তিনি ৪০ বছরের সেরা অ্যাশেজ নেন জায়গা করে নেন দর্শকদের বিচারে। আজও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটই তার একমাত্র প্যাশন।

আর এসবের কিচ্ছু না ঘটলেও, এ লেখার প্রথম প্যারায় বর্ণিত স্টিভ ওয়াহ’র বাড়িতে আগুন নেভাতে ছুটে যাবার জন্যই গ্লেন ম্যাকগ্রাকে মনে রেখে দিত সারা দুনিয়া।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...