একজন অকীর্তিত নায়ক

মাত্র ৩৫-এর মত বয়সে যখন নিজের বুটজোড়া তুলে রাখার হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন তখনও কিন্তু তিনি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দলের ভবিষ্যতের ভাবনায় আছেন। যদিও শেষ কয়েকটি সিরিজ তার পক্ষে ভালো যায়নি। এখানেই তো তিনি আলাদা, সমর্থকদের আরও ভালোলাগার কারণ, নিজের সেরা সময় বুঝে সরে যাও সেটা যে সময়ই হোক।

আমার টিভিতে দেখা প্রথম সবচেয়ে বড় কোনো ক্রিকেট ম‍্যাচ ছিল ২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনাল। আর সেই ম‍্যাচে যখন সৌরভ গাঙ্গুলির দল খেলবে – তখন সেটা ছিল আমাদের জন্য আনন্দের এক উপলক্ষ্য।

কিন্তু, ওয়ান্ডারার্সে যখন টসে জিতে বল করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সৌরভ গাঙ্গুলি তখন বড়রা বলেছিল ‘এমন চাপের ম‍্যাচে টসে জিতে কেউ বোলিং নেয়, তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার মতো এমন দলের বিরুদ্ধে।’ যদিও ওই প্রতিযোগিতায় ভারতীয় তিন পেসার অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিল তা নতুন বল হোক কিংবা ডেথে।

মনে আশংকার যে একটা মেঘ জমেছিল তা বাস্তবায়িত হতে দেরী হয়নি।শুরু থেকেই অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ম‍্যাথু হেইডেন ভারতীয় পেসারদের উপর বুলডোজার চালিয়ে দেন। শুরুতেই ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতীয় দলকে ফিরিয়ে আনেন টার্বুনেটর, দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে। যতই শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মিডিল অর্ডার ব‍্যাটিং লাইনআপ হোক, ভারত যে বরাবরের মতো লড়াই করে ম‍্যাচে ফিরে আসবে তা ভেবেই আমাদের মতো প্রত‍্যেক ভারতবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল।

কিন্তু ভাবনা এক জিনিস আর করে দেখানো বা মনস্কামনা পূর্ণ হওয়া আরেক জিনিস। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক যে অসাধারণ ক্রিকেটার তা তখন জানলেও বা প্রচুর নাম শুনলেও, আমার কাছে অচেনা ড‍্যামিয়েন মার্টিন নামের এক ভদ্রলোক, রিকি পন্টিংয়ের সাথে ‘অতিমানবীয়’ ভয়ংকর জুটি বেঁধে ভারতকে খাদের কিনারায় এসে দাড়করিয়ে দিয়েছিল যা হতে ভারতীয় দল আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছিল ওখানেই। কিন্তু আমার কাছে পরিচিত হয়েছিল অসাধারণ একজন ক্রিকেটারের, যাকে এরপর যতটুকু দেখেছি বা শুনেছি ততবারই আরও প্রিয় একজন হয়ে উঠেছিলেন।

ডিন জোন্সের ফেলে রাখা জুতোই পা গলানোটা সহজ ব‍্যাপার ছিল না। তিনি হয়তো তা করতেও চাননি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট তখন নিজেদের এমন মানদণ্ডের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে যে, ১৯৯২ সালে অভিষেকের পর ড‍্যামিয়েন মার্টিন জানতেন নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে অন‍্য কেউ তার জায়গা কেড়ে নেবে এবং তখন হয়তো ফিরে আসা কঠিন হবে।

শুরুর দিকে এই নিজেকে প্রমাণ করবার চেষ্টাতেই মাঝে মাঝে বেপরোয়া হয়ে উঠবার চেষ্টা করতেন। মাঝে মাঝে সফল হতেন, মাঝে মাঝে হতেন না। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে শুরু করে দিয়েছিল তার মানসিকতা, দায়বদ্ধতা নিয়ে। ১৯৯৩/৯৪ তে সিডনিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে মাত্র ১১৭ তাড়া করতে নেমে ৭৫ রানে ৮ উইকেট হারানোর পর ইনি যখন ক্রেগ ম‍্যাকডারমটকে নিয়ে জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ৭ রান দূরে অবস্থায় আবার তাঁর বিচক্ষণতার অভাব দেখা গেলো। অ্যালান ডোনাল্ডকে কভারের উপর দিয়ে র‍্যাম্প শট করতে গিয়ে আউট হয়ে দলকে লজ্জার পাঁচ রানে হারের সম্মুখীন করেছিল।।এই সাত রান তার ক‍্যারিয়ার প্রায় সাত বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।।

মাঝে দু একবার সুযোগ পেলেও ২০০০ সালে যখন প্রকৃত কামব্যাক করলেন সেই বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়া দলে, যারা সেসময় দেশে বিদেশে নিজেদের বিজয়পতাকা উড়িয়ে চলছেন। অসাধারণ সব ক্রিকেটারদের মাঝেও সেই দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজেকে তৈরী করতে এবার আর কোনো ভুল করেননি। ২০০১ এর অ্যাশেজে অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে উইজডেনের বর্ষসেরার খেতাব দেয়।

২০০৩-এর বিশ্বকাপে নিজের ও দলের সাফল্য তাকে আরও স্থায়িত্ব এনে দেয়। মার্ক ওয়াহর অবসরের পর চার নম্বর পজিশনে ব‍্যাট করবার সুযোগ পেতেই নিজের সেরা গুলো আরও প্রবল ভাবে বেরিয়ে আসে। শ্রীলঙ্কায় সাফল্য, ভারতে এসে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ে সিরিজ সেরা হওয়া, কিংবা ২০০৬ সালের চাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অসাধারণ সাফল্য গুলো তাঁর অর্জন করবার ক্ষমতা আর দক্ষতাকে বারবার বিশ্বের সামনে এনে দিয়েছিল।

মাত্র ৩৫-এর মত বয়সে যখন নিজের বুটজোড়া তুলে রাখার হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন তখনও কিন্তু তিনি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দলের ভবিষ্যতের ভাবনায় আছেন। যদিও শেষ কয়েকটি সিরিজ তার পক্ষে ভালো যায়নি। এখানেই তো তিনি আলাদা, সমর্থকদের আরও ভালোলাগার কারণ, নিজের সেরা সময় বুঝে সরে যাও সেটা যে সময়ই হোক।

ক্রিকেটার হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি? মার্টিন ছিলেন একজন শ্রমিক শ্রেণীর ক্রিকেটার, যার হয়তো অসাধারণ প্রতিভা ছিল না, কিন্তু নিজেকে গড়েছেন-ভেঙেছেন এবং নিজের সেরাটা দেওয়ার প্রচেষ্টায় বারবার নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন। তাঁর ধৈর্য্য, টেম্পারপেন্ট, দলের অবস্থান বোঝার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

‘কপিবুক স্টাইল’ ও টেকনিক্যালি অসাধারণ এই ব‍্যাটসম‍্যান উইকেটের দুই দিকে অসাধারণ সব শট নিতে পারতেন, যদিও তার কাভার ড্রাইভ গুলো সবসময় চোখে ভাসতো। তাঁকে দেখে সবসময় ‘ওল্ড-স্কুল অ্যাটিচিউড’ ক্রিকেটারদের কথা মনে হতো। পেস ও স্পিন দুটোতেই সমান দক্ষ ছিলেন তাই উপমহাদেশের উইকেটেও সমান সফল তিনি।

প্রথাগত ব‍্যাটিংয়ের বাইরে এসে স্পিনারদের বিরুদ্ধে ‘সুইপ ও রিভার্স সুইপ’ করেও সফল তিনি। ওইসময়ের অসাধারণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের মাঝে তার নাম খুব কম শোনা যেতো, কিন্তু তিনি তার কাজ সুচারুভাবেই করতেন যেহেতু এনার মধ্যে কোনোদিন নিজেকে সবার সামনে জাহীর করবার ভাবনা ছিল না।।আর ফিল্ডার হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...