বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন

ক্রিকেট বিশ্বের হায়ারার্কিতে যাদের বরাবর ওপরের সারিতে বসানো হয়, যাদের মাটিতে জেতা শ্রীলঙ্কার মতো দলের কাছেও এখনও অধরা স্বপ্ন—সেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে সেই কাতারে, যেখানে দাঁড়ানোর অধিকার তাদের বহুদিন ধরেই ছিল, শুধু স্বীকৃতিটাই মেলেনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন অর্জন আর নেই। ৯৭’র আইসিসি ট্রফি নয়, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর সেই গর্বও নয়—ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোটা তার চেয়েও বড়। কারণ এই জয় এসেছে ক্রিকেট বিশ্বের সেই মোড়লের বিপক্ষে, যারা বছরের পর বছর নানাভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশ আসলে টেস্ট খেলার যোগ্যই না।

যাদের এক প্রয়াত ক্রিকেটার-ধারাভাষ্যকার একদিন বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশকে তো একদিনেই শেষ করে দেওয়া যায়। যারা নানা অজুহাতে গত তেইশ বছর বাংলাদেশকে নিজেদের মাটিতেই ডাকেনি। সেই অস্ট্রেলিয়াতেই গিয়ে, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই হারিয়ে বাংলাদেশ গড়ল এমন এক ইতিহাস, যা যেকোনো প্রথম সারির ক্রিকেট দলেরও স্বপ্ন।

তেইশ বছর—সংখ্যাটা এমনি এমনি বলা নয়। ২০০৩ সালের পর বাংলাদেশ আর কখনও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগই পায়নি। প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাত, প্রতিবারই সূচি থেকে বাদ। যেন ধরেই নেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশকে নিজেদের উঠোনে ডাকার দরকারই নেই। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার যখন সুযোগ এলো, বাংলাদেশ শুধু অংশ নিতে যায়নি—গিয়ে ইতিহাস লিখে ফেললো।

আর সেই ইতিহাসের শুরুটা ছিল রীতিমতো লজ্জার। প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়া দলটাকে নিয়ে হাসাহাসি হয়েছিল খোদ অস্ট্রেলিয়াতেই। বিশ্লেষক কিংবা দর্শকরাই ভেবে নিয়েছিলেন, টেস্ট গড়াবে না তৃতীয় দিনের বেশি। অথচ সেই দলই চারশোর বেশি উইকেট-শিকারি চার বোলার নিয়ে গড়া পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল—তাও নিজেদের মাঠে, নিজেদের দর্শকদের সামনে, চতুর্থ দিনেই, ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।

এই জয় শুধু একটা স্কোরলাইন নয়। এটা এক ধরনের প্রতিশোধ—বছরের পর বছর ছোট করে দেখার প্রতিশোধ। যে বোর্ড বাংলাদেশকে নিজেদের সূচিতে জায়গা দিতে গড়িমসি করেছে, যে ক্রিকেট সংস্কৃতি বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদার যোগ্য মনে করেনি প্রকাশ্যে, সেই সবকিছুর জবাব একসঙ্গে দিয়ে দিল হাসান-মিরাজ-তানজিদরা।

২০১৭ সালে ঢাকায় সাকিব আল হাসানের ১০ উইকেটের কীর্তিতে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, নিজেদের চেনা স্পিন-সহায়ক উইকেটে। কিন্তু এবার লড়াইটা হলো তাদেরই মাটিতে, তাদেরই পছন্দের কন্ডিশনে—আর সেখানেই বাংলাদেশ প্রমাণ করল, এই জয় কোনো অঘটন নয়।

ক্রিকেট বিশ্বের হায়ারার্কিতে যাদের বরাবর ওপরের সারিতে বসানো হয়, যাদের মাটিতে জেতা শ্রীলঙ্কার মতো দলের কাছেও এখনও অধরা স্বপ্ন—সেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে সেই কাতারে, যেখানে দাঁড়ানোর অধিকার তাদের বহুদিন ধরেই ছিল, শুধু স্বীকৃতিটাই মেলেনি।

আর এই জয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে আরও একটা পরিসংখ্যান, যা এই কীর্তিকে করে তুলেছে আরও উজ্জ্বল। পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জিততে খেলেছিল সাতটি টেস্ট, ভারতের লেগেছিল ১২টি, আর শ্রীলঙ্কা এখনও পর্যন্ত ১৫টি টেস্ট খেলেও সেই স্বাদ পায়নি।

বাংলাদেশ সেই জায়গায় করে দেখাল মাত্র তৃতীয় টেস্টেই—এশিয়ার দেশ হিসেবে সবচেয়ে কম টেস্ট খেলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয়ের নজির গড়ল টাইগাররা। ডারউইনের রোদে পোড়া মাঠে সেই স্বীকৃতিটাই আদায় করে নিল বাংলাদেশ—নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে, নিজেদের শর্তে, আর সবচেয়ে কম সময়ে।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link