লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড জীবনে আদৌ পাননি তিনি

এটা একজন মানুষের গল্প, যিনি অসংখ্যবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল। তিনি শেষবারের মত অপেক্ষা, এক চিলতে হাসি দিয়ে কেড়ে নিবেন প্রতিপক্ষের রাতের ঘুম। এটা সেই মানুষের শেষ গল্প যিনি, জীবনে আদৌ কখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাননি।

ক্যানসাস সিটির আকাশে তখন আর্জেন্টিনার পতাকার ঢেউ। স্টেডিয়ামের বাইরে হাজারো কণ্ঠে একটাই নাম— লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বয়স প্রায় ৩৯ ছুঁইছুঁই। তবুও তিনি আছেন। অধিনায়ক হিসেবে, স্বপ্নের বাহক হিসেবে, আর হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে।

২০২২ সালে কাতারের মরুভূমিতে যখন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফিটা দু’হাতে তুলে ধরেছিলেন, মনে হয়েছিল গল্পটা শেষ। ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি যেন লিখে ফেলেছেন তিনি। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো এত সহজে বিদায় নেন না। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ এসেছে মেসির জন্য আরেকটি ট্রফির নয়, বরং নিজের গল্পের শেষ লাইনটা নিজেই লেখার সুযোগ হয়ে।

লিওনেল মেসির গল্পটা আসলে কোনো সাধারণ ফুটবলারের গল্প নয়। এটা এমন এক মহাকাব্য, যেখানে নায়ককে বারবার হারতে হয়েছে, ভেঙে পড়তে হয়েছে, অপমান সহ্য করতে হয়েছে— তারপর একদিন পুরো পৃথিবীকে নিজের সামনে তিনি মাথা নত করতে বাধ্য করেন। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায় শুরু হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।

লিওনেল মেসির গল্পটা আসলে কোনো সাধারণ ফুটবলারের গল্প নয়। এটা এমন এক মহাকাব্য, যেখানে নায়ককে বারবার হারতে হয়েছে, ভেঙে পড়তে হয়েছে, অপমান সহ্য করতে হয়েছে— তারপর একদিন পুরো পৃথিবীকে নিজের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করেছেন। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায় শুরু হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপে প্রথমবার পা রেখেছিলেন এক কিশোর মেসি। বয়স তখন মাত্র ১৮। সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে বদলি হয়ে নেমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অ্যাসিস্ট, তারপর গোল।

পুরো বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল, নতুন এক তারকার জন্ম হয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল বেঞ্চে বসে থাকা এক হতাশ ছেলের ছবিতে। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে তাকে মাঠে নামানো হয়নি, আর আর্জেন্টিনার বিদায়ের সঙ্গে সেদিন তার হৃদয়েও জমেছিল প্রথম বিশ্বকাপের আক্ষেপ।

চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি আর প্রতিভাবান কিশোর নন, তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার। ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসির কাঁধে তখন পুরো জাতির স্বপ্ন। কোচের আসনে তারই শৈশবের নায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা। সবাই ভেবেছিল, এবারই বুঝি মুকুট পরবেন মেসি। কিন্তু জার্মানি আবারও সামনে এসে দাঁড়াল দেয়াল হয়ে। ৪-০ গোলের লজ্জাজনক হার, আর পুরো টুর্নামেন্টে একটিও গোল না পাওয়া মেসি। বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়েও বিশ্বকাপ তাকে আপন করে নেয়নি।

তারপর এলো ২০১৪। অনেকের মতে, সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। ব্রাজিলের মাটিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেন তিনি। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এবার ইতিহাস লেখা হবে।

কিন্তু ইতিহাসেরও কখনও কখনও নিষ্ঠুর হতে যেন ভালো লাগে। ম্যারাকানার আলো ঝলমলে রাতে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গ্যোৎজের এক গোল সবকিছু কেড়ে নিল। ফাইনাল শেষে বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়া মেসির সেই ছবি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় পৌঁছানোর আগেই তিনি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। জাতীয় দল নিয়ে সমালোচনা, কোপা আমেরিকার ফাইনাল হার, সাময়িক অবসর— সব মিলিয়ে চারদিক থেকে চাপ। বিশ্বকাপও হয়ে উঠল দুঃস্বপ্ন। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণ, তারপর ফ্রান্সের কাছে বিদায়। তখন মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল গল্পটা হয়তো অসমাপ্তই থেকে যাবে।

কিন্তু সবচেয়ে অন্ধকার রাতের পরই ভোর হয়, সূর্য ওঠে। ২০২২ সালে কাতারে যেন নতুন এক মেসির জন্ম হলো। সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর পুরো আর্জেন্টিনা যখন ধ্বংসের কিনারায়, তখন অধিনায়ক নিজের কাঁধে তুলে নিলেন পুরো জাতিকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই বজ্রপাতের মতো গোল, এরপর একের পর এক জাদুকরী মুহূর্ত।

সাত গোল, পাঁচ অ্যাসিস্ট আর অসংখ্য স্মরণীয় দৃশ্য উপহার দিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন লুসাইলের সেই মহারণে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনালের শেষে যখন বিশ্বকাপ ট্রফি তার হাতে উঠল, তখন শুধু একটি টুর্নামেন্ট জেতেননি তিনি। তিনি জিতে নিয়েছিলেন সময়কে, ইতিহাসকে, আর কোটি মানুষের হৃদয়কে।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির সামনে আর কিছু প্রমাণ করার নেই। তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। কোপা আমেরিকা জিতেছেন। ফুটবলের প্রায় সবকিছুই অর্জন করেছেন।

তবু তিনি এসেছেন। হয়তো কিছু রেকর্ড ভাঙতে। হয়তো আরেকবার কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। অথবা হয়তো শুধু এই কারণে— বিদায়টা যেন নিজের শর্তে হয়।

এই বিশ্বকাপ তাই ট্রফির জন্য নয়। এটা একটা রুগ্ন ছেলের গল্প, যে রোজারিও থেকে শুরু করে ফুটবলের চূড়ায় উঠেছিল। এটা গ্রোথ হরমোনের গ্রাস থেকে বের হয়ে বিশ্ব শাসনের গল্প। এটা অসংখ্য অপমানের জ্বালা মিটিয়ে গর্জে ওঠার গল্প।

এটা একজন মানুষের গল্প, যিনি অসংখ্যবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল। তিনি শেষবারের মত অপেক্ষা, এক চিলতে হাসি দিয়ে কেড়ে নিবেন প্রতিপক্ষের রাতের ঘুম। এটা সেই মানুষের শেষ গল্প যিনি, জীবনে আদৌ কখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাননি।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link