অনন্য এক রান দানবের গল্প

কন্ডিশন বা বোলার যেমনই হোক, ক্রিজে জয়াবর্ধনে ছিলেন অবিচল দৃঢ়তার প্রতীক। সুনিপুণ ব্যাটিং কারিকুরি আর রানের বৃষ্টিতে দুই যুগ ধরে অশান্ত এক জাতির মনেও যে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেওয়া যায়, তা হয়তো তাকে না দেখলে কখনো জানতেই পারতো না দুনিয়া।

কলম্বোর বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ। চারদিকে গৃহযুদ্ধের আর্তনাদ। ঠিক সেই সময়েই ২২ গজে জন্ম হয় এক বিস্ময় বালকের। নাম মাহেলা জয়াবর্ধনে, ব্যাট হাতে ক্রিকেট ইতিহাসে যিনি লিখে রেখে গেছেন অতি মানবীয় ‘রান দানব’ হয়ে ওঠার গল্প।

জয়াবর্ধনের ব্যাট যেন ছিল নন্দনতত্ত্বের আঁতুড়ঘর। ক্ল্যাসিক কাভার ড্রাইভ, কবজির মোচড়ে ফ্লিক কিংবা শেষ মুহূর্তের লেট কাটে তার ব্যাট থেকে ছড়াত নিখুঁত ক্রিকেটীয় সুরের মূর্ছনা। কিন্তু এই রাজসিক ব্যাটিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বিষাদময় লড়াই।

কৈশোরে আদরের ছোট ভাই ধিশালকে ব্রেন টিউমারে হারান মাহেলা। ভাইয়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে বিপুল ঋণ নিতে হয় তার পরিবারকে। সেই ঋণ শোধ করতেই কিশোর জয়াবর্ধনের ক্রিকেটে আগমন। তারপর? তারপর, ক্রিজে ব্যক্তিগত শোক বদলে যায় শক্তিতে। জয়াবর্ধনে হয়ে ওঠেন এক অপ্রতিরোধ্য ব্যাটিং সেনসেশন!

মাঠে নামলেই জয়াবর্ধনে হয়ে উঠতেন এক রান দানব। ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার ৩৭৪ রানের সেই মহাকাব্যিক ইনিংসের দিকে চোখ ফেরালে আজও যে কোনো ক্রিকেটপ্রেমী পুলকিত হবেন। কলম্বোয় সেই ম্যাচে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কুমার সাঙ্গাকারার সাথে গড়ে তোলা ৬২৪ রানের বিশ্বরেকর্ড জুটি আজও ক্রিকেটের অম্লান এক রূপকথা।

অধিনায়ক হিসেবেও মাহেলা অসাধারণ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই লঙ্কানরা প্রথমবার ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জয় করে। ২০০৯ সালে লাহোরে টিম বাসে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার মতো দুর্বিষহ দিনেও শ্রীলঙ্কা দলকে সামনে থেকে পথ দেখান তিনি। বৃষ্টির মতো গুলি আর বোমা বর্ষণের মুখেও শান্ত থেকে নিজেই লঙ্কান প্রেসিডেন্টকে ফোন করে দলকে নিরাপদে দেশে ফেরান এই দলপতি।

তবু শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বহুমুখী চাপ জয়াবর্ধনেকে মুক্তি দেয়নি। ২০১২ সালে তাই দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছাড়েন এই ডানহাতি ব্যাটার।

কিন্তু জয়াবর্ধনের বড় পরিচয় অধিনায়ক নয়, তিনি এক শাশ্বত ব্যাটিং স্তম্ভ। মাঠে নামলেই তার ব্যাট হয়ে উঠতো স্বমহিমায় ভাস্বর। তাই ক্যারিয়ার শেষে তার নামের পাশে প্রায় ১২ হাজার টেস্ট রান।

৩৭৪, ২৭৫, ২৪২, ২৪০, ২৩৭ কিংবা অপরাজিত ২১৩-এর মতো দীর্ঘ সব ইনিংস ধারাবাহিকভাবে খেলে ক্রিকেট দুনিয়ায় তিনি গড়েছেন অনন্য সব নজির। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন সমানভাবে। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তার ৮৮ বলে অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংস সেটিরই প্রমাণ।

প্রতিকূলতার ধরন, কন্ডিশন বা বোলার যেমনই হোক, ক্রিজে মাহেলা জয়াবর্ধনে ছিলেন অবিচল দৃঢ়তার প্রতীক। সুনিপুণ ব্যাটিং কারিকুরি আর রানের বৃষ্টিতে দুই যুগ ধরে অশান্ত এক জাতির মনেও যে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেওয়া যায়, তা হয়তো তাকে না দেখলে কখনো জানতেই পারতো না দুনিয়া। আর এখানেই অনন্য এই রান দানব।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link