মেসি যদি একশ বছর আগে জন্মাতেন, তাহলে কি তাঁর নামের পাশে আর্জেন্টিনা লেখা থাকত? প্রশ্নটা অদ্ভুত শোনালেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইতালি, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ঘুরে আসা এক অবিশ্বাস্য পারিবারিক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসই আজও জন্ম দেয় একটি ভাইরাল দাবির—‘মেসি আগে ইতালিয়ান, পরে ব্রাজিলিয়ান, শেষে আর্জেন্টাইন।’
বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি জন্মসূত্রে এবং পরিচয়ে সবসময়ই আর্জেন্টাইন। তবে তাঁর পরিবারের শিকড় ছড়িয়ে আছে ইতালি ও ব্রাজিলে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলা সেই অভিবাসনের গল্পই তাঁকে ঘিরে তৈরি করেছে এক অসাধারণ পারিবারিক ইতিহাস।
মেসির বাবার পরিবারের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল ইতালির মারকে অঞ্চলে। ১৮৯৩ সালে অ্যাঞ্জেলো মেসি ও মারিয়া লাতিনি ভালো ভবিষ্যতের আশায় ইতালি ছেড়ে জাহাজে আর্জেন্টিনার উদ্দেশে রওনা হন। জেনোয়া থেকে যাত্রা শুরু করে বার্সেলোনায় যাত্রাবিরতির পর তারা পৌঁছান বুয়েনস আইয়ার্সে। পরে পরিবারটি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে রোজারিও অঞ্চলে। প্রায় একশ বছর পর সেই রোজারিওতেই জন্ম নেন লিওনেল মেসি।

মায়ের পরিবারের গল্প আরও ব্যতিক্রমী। মেসির মায়ের পূর্বপুরুষ রানিয়েরো কোকেত্তিনি ও তাঁর স্ত্রী রোজা রিক্কেজ্জা ১৮৯৯ সালে ইতালি ছেড়ে ব্রাজিলের সাও পাওলোর সান্তোস বন্দরে পৌঁছান। সেখানে কৃষিকাজ শুরু করেন এবং পরিবারের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।ব্রাজিলে থাকাকালীনই ঘটে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।
সরকারি নথিভুক্তির সময় ইতালীয় নামের বানান বদলে যায়। রানিয়েরোর ছেলে আরদেরিগো কোকেত্তিনি সরকারি কাগজে হয়ে যান ‘ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনি’। ইতিহাসে এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনিই ছিলেন মেসির মায়ের দাদা। অর্থাৎ, আজ যে ‘কুচ্চিত্তিনি’ পদবিটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তার বর্তমান রূপের জন্ম হয়েছিল ব্রাজিলেই।
তবে ব্রাজিলে তাদের বসবাস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯০৫ সালে পরিবারটি আবার পাড়ি জমায় আর্জেন্টিনায় এবং রোজারিও অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম হয়। সেই বংশধারায় জন্ম নেন সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি, আর তাঁরই ছেলে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

তাই ‘মেসি আগে ইতালিয়ান, পরে ব্রাজিলিয়ান, শেষে আর্জেন্টাইন’—এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। সত্যটা হলো, মেসির পারিবারিক শিকড় ইতালিতে, তাঁর মাতৃপরিবারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে ব্রাজিলে, কিন্তু তিনি নিজে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন এবং পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার জুড়েই প্রতিনিধিত্ব করেছেন আর্জেন্টিনার।
ইতালি তাঁকে দিয়েছে পারিবারিক শিকড়, ব্রাজিল লিখেছে তাঁর পরিবারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর আর্জেন্টিনা দিয়েছে পরিচয়, স্বপ্ন আর ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা এক কিংবদন্তিকে। রোজারিওর ছোট্ট এক ছেলে যে একদিন বিশ্বকাপ জিতে কোটি মানুষের হৃদয়ের নায়ক হবে, সেই গল্পের শুরু হয়েছিল আসলে তাঁর জন্মেরও বহু আগে—এক পরিবারের মহাদেশ পেরিয়ে চলা দীর্ঘ যাত্রায়।











