ক্রিকেটে ব্যাটিং কি স্রেফ পেশিশক্তির আস্ফালন? নাকি ২২ গজের ক্যানভাসে আঁকা এক বিষণ্ণ সুন্দর কবিতা? এই প্রশ্ন বারবারই ফিরে আসে যখন দর্শকদের সামনে কবজির জাদুতে ক্রিকেটকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ভিভিএস লক্ষ্মণের নাম উচ্চারিত হয়।
হায়দরাবাদি এই কিংবদন্তি ভারতীয় জনপ্রিয় ব্যাটার আজহারউদ্দিনের যোগ্য উত্তরসূরি হলেও, ব্যাটিং স্বকীয়তায় ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকেই। আজহার যেখানে শর্ট বলে মাঝেমধ্যে অস্বস্তিতে ভুগতেন, লক্ষ্মণ সেখানে ছিলেন পর্বতের মতো অটল ও সাবলীল।
মাঠের লড়াইয়ে লক্ষ্মণের সবচেয়ে বড় স্বকীয়তা ছিল তার অনন্য ‘পুল শট’-এ। শচীন টেন্ডুলকারের পুলে ছিল তেজ, রাহুল দ্রাবিড়ের ছিল মাপা পরিমিতিবোধ আর বীরেন্দর শেবাগের ব্যাটে ছিল শক্তিশালী মুভমেন্ট। কিন্তু লক্ষ্মণ? তাঁর কাছে পুল শট যেন স্বভাবজাত এক জাদুর ছোঁয়া। রিকি পন্টিং বা ম্যাথু হেইডেনের মতো কোনো পেশির আস্ফালন তাতে ছিল না। ছিল কেবল আভিজাত্য আর অবিশ্বাস্য টাইমিংয়ের মেলবন্ধন।

২০১০ সালের মোহালি টেস্টের সেই রোমহর্ষক দৃশ্যটি এখনও ভাস্বর ক্রিকেটমোদীদের চোখে। জয়ের জন্য ভারত তখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। অজি পেসার বেন হিলফেনহস ভয়ানক এক বাউন্সার দিলেন। লক্ষ্মণ ব্যাকফুটে গিয়ে কবজিটা আলতোভাবে ঘুরিয়ে দিলেন। ব্যস! বল নিখুঁতভাবে দুই ফিল্ডারের মাঝ দিয়ে সীমানায় চলে গেল। চাপের মুখে এমন নির্ভার শিল্প কেবল লক্ষ্মণের পক্ষেই দেখানো সম্ভব।
তাই বোদ্ধারা বলে থাকেন, চারদিকে যখন বিপদের সাইরেন বাজত, লক্ষ্মণ তখন সুর তুলতেন জাদুকরী সিম্ফনির। সংকট এলেই তিনি হয়ে উঠতেন এক অনন্য শিল্পী। ২০০১ সালে ব্লুমফন্টেইনে পেস গতির ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ভারত। কিন্তু সেদিন দমে যাননি ডানহাতি ব্যাটার। নবম ওভারে শন পলকের আগ্রাসী বাউন্সারকে যেভাবে অলস ভঙ্গিমায় তিনি ছক্কায় পরিণত করেছিলেন, তা ছিল এক পরিপূর্ণ মাস্টারপিস। অথচ পুরো টেস্ট ক্যারিয়ারে তার ছক্কার সংখ্যা মাত্র পাঁচটি।
তবু লক্ষ্মণ মানেই যেন চিরায়ত আভিজাত্যের প্রতীক। তাঁর ব্যাটের প্রতিটি পরশ, বিশেষত পুল শটগুলো ক্রিকেটের ক্যানভাসে একেকটি কালজয়ী তুলির আঁচড়। যেন কেবল একজন ব্যাটসম্যান নন, ২২ গজের এক মায়াবী শিল্পী তিনি।











