ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পের কথা উঠলে ১৯৯২ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের কথা আসবেই। যে দলটির টুর্নামেন্টে খেলার কথাই ছিল না, প্লেয়াররা যখন যার যার মতো গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ব্যস্ত। অথচ হঠাৎ পাওয়া ডাকে এসে সেই দলটিরই ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গল্প আজও বিশ্ব ফুটবলের এক বিস্ময়। সেই রূপকথার নায়ক – ডেনমার্ক।
১৯৯২ ইউরো কাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুইডেনে। ইউরোর বাছাইপর্বে নিজ গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পায়নি ডেনমার্ক। স্বভাবতই ডেনিশ ফুটবলাররা নিজেদের ক্লাব মৌসুম শেষে বিশ্রামে চলে যান। কেউ ছিলেন ক্লাবের ছুটিতে, কেউ আবার সমুদ্রসৈকতে।
কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র দশ দিন আগে ঘটে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়। বলকান অঞ্চলের রাজনৈতিক গৃহযুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে তৎকালীন জুগোস্লাভিয়া ফুটবল দলের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ। ফলে ইউরোর টিকিট পাওয়া সত্ত্বেও জুগোস্লাভিয়াকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয় বাছাইপর্বে তাদের পেছনে থাকা ডেনমার্ককে।

প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না। তৎকালীন বিশ্বসেরা খেলোয়াড় ও দলের সবচেয়ে বড় তারকা মাইকেল লাউড্রপ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে মতভেদের কারণে খেলাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে কোচ রিচার্ড মোলার নিয়েলসনকে অতি সাধারণ এক স্কোয়াড নিয়েই সুইডেনের বিমান ধরতে হয়।
টুর্নামেন্টের শুরুটা ডেনমার্কের জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের সাথে শূন্য-শূন্য গোলে ড্র করার পর দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক সুইডেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। সবাই ভেবেছিল ছুটির মেজাজে আসা ডেনমার্কের সফর এখানেই শেষ। কিন্তু গ্রুপের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা।
সেমিফাইনালে ডেনমার্কের সামনে ছিল তখনকার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ও তারকাখচিত নেদারল্যান্ডস দল। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ২-২ গোলে সমতায় শেষ হওয়ার পর খেলা গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে ডেনিশ গোলরক্ষক পিটার স্মাইকেলের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ডাচদের হারিয়ে ফাইনালে ওঠে তারা।

২৫ জুন, ১৯৯২। গোটেনবার্গের উল্লেভি স্টেডিয়ামে ফাইনালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির মুখোমুখি হয় ডেনমার্ক। শক্তির বিচারে জার্মানি ছিল যোজন যোজন এগিয়ে। কিন্তু কৌশলী ফুটবল আর স্মাইকেলের দেয়ালসম গোলকিপিংয়ের সামনে একে একে পরাস্ত হয় জার্মান আক্রমণভাগ। ম্যাচের ১৮তম মিনিটে জন ইয়েনসেনের দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। এরপর ৭৮তম মিনিটে কিম ভিলফোর্টের ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে জয় নিশ্চিত করে তারা।
শেষ বাঁশি বাজতেই তৈরি হয় নতুন এক ইতিহাস। মাত্র দশ দিনের নোটিশে এসে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ২-০ গোলে হারিয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয় ডেনমার্ক!
কোনো চাপ ছাড়া, ছুটি থেকে সোজা মাঠে নেমে কেবল দলীয় বিশ্বাস আর ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের জোরে ইউরো জয়ের এই ঘটনাটি ফুটবল ক্যালেন্ডারে অমর হয়ে আছে। ১৯৯২ সালের ডেনমার্ক প্রমাণ করেছিল – ফুটবলে সদিচ্ছা আর নিখাদ দলগত শক্তি দিয়ে সব সমীকরণ বদলে দেওয়া সম্ভব।












