উইকেট হারিয়েছে ভারত, চারিদিকে গুমোট ভাব। স্বাভাবিকভাবেই হতাশা বিচ্ছুরিত হওয়ার কথা ইডেনে উপস্থিত ৯০ হাজার দর্শকের চোখে-মুখে। কিন্ত না, সবার নজর বেলকনি দিয়ে নেমে আসা একজনের দিকে। চোখের দৃষ্টিসীমায় তখনও এসে পৌঁছানি সে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি মাড়িয়ে কিংবা কুয়াশার পর্দা ভেদ করে একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছে সেই মুখ। কাঁধ ছুঁয়েছে সোনালি চুল, পিঠে সাত নম্বর জার্সি। ব্যাটখানা ঘোরাতে ঘোরাতে মহেন্দ্র সিং ধোনি পা রাখলেন কাঙ্ক্ষিত মঞ্চে। উইকেট হারানোর হতাশা ভুলে গিয়েছে সবাই, গুমোট ভাব সরে গিয়ে গগন বিদারি চিৎকার শোনা যাচ্ছে, কান পাতলে যার মানে দাঁড়ায় ‘মাহি মাহি’। এভাবেই কেটেছে এক যুগেরও বেশি।
এক বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের একচালা থেকে রাজপ্রাসাদ হয়ে ওঠার সবচেয়ে চওড়া যে মার্গ, যার ওপর অনায়াসে হেঁটে গেছে ম্যান ইন ব্লুজদের সাফল্য। যার দুপাশে গোলাপ হয়ে ফুটেছে একটার পর একটা ট্রফি। তাঁর পাশে কোন বিশেষণ সোভা পায় কি? কেউ যদি প্রশ্ন করেই বসে, ইজ ধোনি গ্রেটার দ্যান ইন্ডিয়ান ক্রিকেট?
অভিষেকের পর থেকে অভূতপূর্ব সেই হেলিকপ্টার শটটাই আকাশে উড়ে বেড়ানোর সোপান হয়ে ধরা দিয়েছিল ধোনির কাছে। এরপর যে পথ তিনি ধরেছেন, যে পথে হেঁটে গেছেন, সে পথে তিনি একা ছিলেন না। তাঁর পিছু পিছু হেঁটে গেছে সাফল্য নামক এক সোনার হরিণ।
২০০৭ সাল। ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর ভারতীয় ক্রিকেটে তখন ভাঙনের শব্দ। অধিনায়কত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়। সামনে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। দায়িত্ব কাউকে তো দিতে হবে। কে ধরিবে হাল, কে করিবে এই তরি পার? এমন এক অনিশ্চিত সময়ে সবার নজর গিয়ে থামল এক আনকোরা তরুণের ওপর। সম্ভাবনার গন্ধ যার গায়ে লেগে আছে, সুবাসিত গোলাপ ফুটবে ফুটবে করছে তখনও।

তারুণ্যে ঠাসা, অভিজ্ঞতায় খর্ব একটা দল পাঠানো হলো বিশ্বকাপে। এমন দলকে নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা, কারও কারও চোখে হয়তো ঘোরতম পাপও। কিন্তু ক্রিকেট তো যুক্তির খেলা নয় সবসময়। কখনো কখনো ক্রিকেট মঞ্চে এমন একজনের আবির্ভাব ঘটে, যিনি হিসাবের খাতা পুড়িয়ে নিজের মতো করে গল্প লিখতে জানেন। দুনিয়া এরপর দেখল এক মগজাস্ত্রের তেলেসমাতি। দেখল, তরুণ এক অধিনায়ক কীভাবে ভয়কে নির্বাসনে পাঠিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেন।
কি আশ্চর্য! সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিশ্বসেরার মুকুট উঠল ভারতের মাথায়। গায়ে চিমটি দিয়ে তবেই বিশ্বাস করতে হলো সবাইকে। সেদিন শুধু একটা ট্রফি জেতেননি ধোনি, ভারতীয় ক্রিকেটকে দিয়ে গিয়েছিলেন নতুন এক বিশ্বাস, অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই ধোনির কাছে।
তারপর এলেন উইকেটের পেছনে। সেখানে তাঁর চরিত্র আরও রহস্যময়। ঠান্ডা মেজাজ। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন অশ্বত্থ গাছের নিচে ধ্যানমগ্ন এক মুনি। চারপাশে ঝড় বয়ে গেলেও তিনি স্থির। অতীত, বর্তমান কিংবা পরের মুহূর্ত, সব যেন তাঁর নখদর্পণে।
খেলাটাকে তিনি শুধু খেলতে দেননি, খেলাটাকে নিজের ইশারায় নাচিয়েছেন। প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা যেন তাঁর হাতের পুতুল। পেছনে দস্তানার ভেতর লুকিয়ে রাখা সুতো, সুযোগ বুঝে টান দিয়েছেন, আর বদলে গেছে ম্যাচের গতিপথ। কখন ফিল্ড সরাতে হবে, কখন বোলার বদলাতে হবে, কখন ব্যাটারকে একটু উসকে দিতে হবে, এসবের উত্তর যেন ম্যাচ শুরুর আগেই লিখে রাখতেন তিনি।

মাঝপথে এলো ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ? ধোনির মহাকাব্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। ঘরের মাঠে কোটি মানুষের প্রত্যাশার পাহাড়। সেই পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার কথা ছিল যে কোনো অধিনায়কের। কিন্তু ধোনি চাপকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, তারপর সেটাকেই বানালেন নিজের মুকুটের পালক। ফাইনালে ৯১ রানের সেই অপরাজিত ইনিংস। আর শেষটাতে সেই বিখ্যাত ছক্কা। ব্যাট উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ধোনি। বল গ্যালারিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল ২৮ বছরের অপেক্ষার দেয়াল। কোটি মানুষের চোখের জল মিশে গেল উৎসবের রঙে। ওয়াংখেড়ের আকাশে সেদিন ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন এক সূর্যোদয় হলো। পরবর্তীকালে যার তেজ কেবলই পুড়িয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষকে।
এসব অতি সাধারণ কোনো গল্প নয়। এই গল্পের প্রতিটি বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে অসম্ভব। আর প্রতিটি অসম্ভবের সামনে দাঁড়িয়ে ধোনি বলেছেন, ‘চল, দেখি’।ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট না হলে কেউ এমন জাদু দেখাতে পারেন না, এমনটা ভাবাও খুব বেশি বাড়াবাড়ি নয়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ওয়ানডে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি,ভারতের কাছে তিনটি রত্ন। ক্রিকেটের মুকুটে এই ত্রিরত্ন একসঙ্গে বসানোর কৃতিত্ব যার, তাঁকে সাধারণ কেউ ভাবা চলে কীভাবে?
ধোনির ভারত শিখিয়েছিল অন্য কিছু, চাপের মধ্যে কীভাবে বাঁচতে হয়, শেষ মুহূর্তে কীভাবে স্নায়ু ঠান্ডা রাখতে হয়, আর পুরো পৃথিবী যখন আপনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে, তখনও কীভাবে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতে হয়। ক্রিকেট মাঠে ধোনি যে সর্বসর্বা। ২১ জন যা ভাবেন, ধোনি তা ভাবেন না। সবাই যখন একদিকে তাকিয়ে, তিনি তখন অন্যদিকে খুঁজেছেন রাস্তা।
শচীন টেন্ডুলকার রাজ করেছেন, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলিরা নিজেদের মতো করে পথ চলেছেন। তবে ধোনি এদের উপর দিয়ে উড়ে বেড়িয়েছেন। সবাইকে ছাপিয়ে নিজের রাজ্য বানিয়েছেন, যেখানে তিনিই নায়ক, সর্বাধিনাক, মহামানব আরও যা কিছু সব তিনি। ধোনি ইজ গ্রেটার দ্যান ইন্ডিয়ান ক্রিকেট, ধোনি ইজ গ্রেটার দ্যান ক্রিকেটও।
শচীন টেন্ডুলকার রাজ করেছেন, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলিরা নিজেদের মতো করে পথ চলেছেন। তবে ধোনি এদের উপর দিয়ে উড়ে বেড়িয়েছেন।সবাইকে ছাপিয়ে নিজের রাজ্য বানিয়েছেন, যেখানে তিনিই নায়ক, সর্বাধিনাক, মহামানব আরও যা কিছু সব তিনি। প্রশ্ন ছিলো, ইজ ধোনি গ্রেটার দ্যান ক্রিকেট? না, ক্রিকেটের চেয়ে বড় কেউ নয়। ধোনি ইজ গ্রেটার দ্যান লাইফ। যে কারনে ধোনি যখন খেলতে নামেন, হোম টিম, এওয়ে টিম বলে কিছু থাকে না। ধোয়ার কুন্ডুলি মাড়িয়ে কিংবা কুয়াশার পর্দা সরিয়ে একটু একটু করে স্পষ্ট হয় সেই মুখ আর গ্যালারি ছাড়িয়ে রাজপথে-সেলুনে-চায়ের দোকানে-টিভি সেটের সামনে বাজে একটাই সুর, ‘মাহি, মাহি!’











