১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ। অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বিপাকে পড়লেন ভারতের কোচ মোহাম্মদ আজহারউদ্দীন। দলের নিয়মিত ওপেনার নভজ্যোৎ সিং সিধু হঠাৎ ঘাড়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করায় এই বিপত্তি। ঠিক সেই মুহূর্তেই আজহারউদ্দিন ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক সাহসী বাজি ধরলেন। ব্যাটিং অর্ডারে তুলনামূলক নিচে খেলা তরুণ শচীন টেন্ডুলকারকে নামালেন তিনি ইনিংসের সূচনা করতে। আর তাতেই নব্বইয়ের দশকের ব্যাটিংয়ে ঘটে যায় বিপ্লব!
তখনকার ওয়ানডে ক্রিকেট ছিল এখনকার চেয়ে একদম আলাদা। প্রথম ১৫ ওভার মানেই ছিল বোলারদের শাসন মেনে ব্যাটারদের উইকেটে টিকে থাকার এক অলিখিত লড়াই। ব্যাটসম্যানরা খেলতেন বেশ রয়ে-সয়ে, প্রথম পাওয়ার প্লে-তে আক্রমণ করার সাহস দেখাতেন না কেউ।
কিন্তু ওপেনার হিসেবে শচীন ক্রিজে পা রেখেই সেই চিরাচরিত ব্যাকরণ ছিঁড়ে ফেলেন। নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর শুরু করেন বিধ্বংসী আক্রমণ। মাত্র ৪৯ বলে তিনি খেলেন ৮২ রানের এক ক্যামিও ইনিংস। নব্বইয়ের দশকের অতি সাবধানী পাওয়ার প্লে পার করার পুরনো ঐতিহ্য শচীন সেদিন একাই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেন। এই ইনিংসটি কেবল ভারতের ওয়ানডে ভাগ্য বদলায়নি, পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে।

ওপেনার হিসেবে শচীনের এই উত্থান ছিল ওয়ানডে ক্রিকেটে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। তিনি উইকেটে আগ্রাসনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ফিল্ডিংয়ের কড়া বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রথম ওভার থেকেই নতুন বলের ওপর চড়াও হতেন এই ডানহাতি ব্যাটার। তাঁর এই অনমনীয় আগ্রাসনের জবাবে বিশ্বসেরা বোলাররাও রক্ষণাত্মক ফিল্ডিং সাজাতে বাধ্য হতেন। ওপেনিংয়ে নেমে দ্রুত রান তোলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে শুরুতেই ম্যাচের বাইরে ছিটকে দেওয়া ছিল তাঁর আসল লক্ষ্য।
পরিসংখ্যানের পাতা ঘাটলে এই রাজকীয় রূপান্তরের গল্প আরও অবিশ্বাস্য মনে হয়। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শুরুতে মিডল কিংবা লোয়ার-অর্ডারে শচীনের ব্যাটিং ছিল অত্যন্ত সাধারণ মানের। ওয়ানডেতে ওপেন করার আগে ১১৯টি ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ৩৩, আর রান ছিল ৩১১৬। কিন্তু ওপেনিং পজিশনে আসতেই তাঁর ব্যাট যেন হয়ে ওঠে শানিত তলোয়ার! ওপেনার হিসেবে খেলা ৩৪৪টি ম্যাচে তিনি একাই সংগ্রহ করেছেন ১৫ হাজার ৩১০ রান! সঙ্গে তাঁর গড়ও এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮.২৯-এ!
নব্বইয়ের দশকে ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন ওপেনার শচীন। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালে শারজায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা তাঁর সেই মহাকাব্যিক “ডেজার্ট স্টর্ম” ইনিংস আজও ক্রিকেটের উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। সেবার ১৩১ বলে ১৪৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।

এখানেই শেষ নয়! আছে আরও একটা বিম্ময়কর তথ্য! তাঁর ক্যারিয়ারের মোট ৪৯টি ওয়ানডে সেঞ্চুরির মধ্যে ৪৫টিই এসেছে ওপেনার হিসেবে ইনিংস শুরু করতে নেমে। এর মধ্যে শুধু নব্বইয়ের দশকেই ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ২৪টি সেঞ্চুরি হাঁকান তিনি, ওয়ানডেতে করেন ৮ হাজার ৫৭১ রান। এমন সব বড় বড় ইনিংস আর সেঞ্চুরির অঙ্কই স্পষ্ট করে দেয়, কীভাবে তিনি ওয়ানডে ক্রিকেটে বিপ্লব ঘটিয়েছেন!
ওপেনিংয়ে নেমে শচীনের দ্রুত রান তোলার প্রবণতা ও অনন্য ব্যাটিং দৃঢ়তার কারণে ভারতের মিডল-অর্ডারের ওপর থেকেও চাপ কমত অনেক। তাঁর এনে দেওয়া দুর্দান্ত শুরুর ওপরে ভিত্তি করেই ম্যান ইন ব্লুজরা খানিকটা নির্ভার হয়ে ম্যাচ জয়ের পথে এগোত।
শচীনের ওপেনিংয়ে আসা নিছক কোনো ক্রিকেটীয় ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিল ওয়ানডে ব্যাটিং ইতিহাসে এক নতুন রূপান্তরের সূচনা। যেন কিংবদন্তি এই ব্যাটারের হাত ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটে ওপেনিং ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে গেছে।











