পিয়ানোর সুর থেকে পতনের কাব্য

মাঠের সেই কালজয়ী ১০ নম্বর জার্সিধারী জাদুকর আর প্রশাসনিক ক্ষমতার মারপ্যাঁচে বিদ্ধ হওয়া পরাজিত আমলা - এই দুই চরিত্র মিলেই মিশেল প্লাতিনি।

১৯৮৫ সালের টোকিও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের ফাইনাল। রেফারির অদ্ভুত এক সিদ্ধান্তে গোল বাতিল হতেই মিশেল প্লাতিনি ক্ষোভে চেঁচিয়ে ওঠেননি, বরং ঘাসের ওপর কাত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন এক বিষাদগ্রস্ত গ্রীক দেবদূতের মতো।

​সেই এক ফ্রেমের ছবিই পুরো প্লাতিনিকে চেনার জন্য যথেষ্ট। তিনি মাঠে কোনো রক্তাক্ত লড়াই লড়তেন না, তিনি জীবন আর ফুটবলকে দেখতেন কেবল নান্দনিকতার চশমায়।

ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ফরাসি তরুণ ন্যান্সি ক্লাব থেকে যাত্রা শুরু করে সেন্ট-এতিয়েন হয়ে যখন ১৯৮২ সালে জুভেন্টাসে যোগ দেন, ইতালি তখন রক্তগরম ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের রাজধানী।

কিন্তু ইতালীয় ডিফেন্ডারদের নির্দয় ট্যাকল আর ইটের মতো শক্ত রক্ষণভাগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্লাতিনি হয়ে উঠেছিলেন ওল্ড নারীর অবিসংবাদিত রাজপুত্র। মিডফিল্ডার হয়েও পরপর তিন মৌসুম সেরি আ-র শীর্ষ গোলদাতা হওয়া কিংবা টানা তিনবার ‘ব্যালোন ডি’অর’ জয়ের কীর্তি সে যুগে কেবল কল্পনাই করা যেত।

১৯৮৪ ইউরো কাপে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে পাঁচ ম্যাচে নয়টি গোল করার যে অলৌকিক মহাকাব্য তিনি লিখেছিলেন, তা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় এক ব্যক্তিগত আধিপত্যের গল্প।

তবে প্লাতিনির ক্যারিয়ার মানেই কেবল ট্রফি আর ঝলমলে আলো নয়। তাঁর জীবনে রয়েছে হেয়সেল স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডির মতো এক কালো অধ্যায়। ১৯৮৫ সালের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে জুভেন্টাস ও লিভারপুলের ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারি ধসে নিহত হন ৩৯ জন সমর্থক।

লাশের ওপর দাঁড়িয়ে খেলা সেই অভিশপ্ত ম্যাচে প্লাতিনির পেনাল্টি গোলেই জয় পায় জুভেন্টাস। বিজয়ের পর তাঁর সেই উল্লাস পরবর্তীতে চরম সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল, যদিও প্লাতিনি দাবি করেছিলেন গ্যালারির ভয়াবহতা সম্পর্কে মাঠে তখন তারা কিছুই জানতেন না।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে বুট জোড়া তুলে রেখে যখন তিনি প্রশাসনিক জগতে পা রাখলেন, গল্পটি মোড় নিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে। ২০০৭ সালে উয়েফা সভাপতি হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ছোট দেশগুলোর ক্লাবকে সুযোগ দেওয়া কিংবা ‘ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ চালু করে ফুটবলে অর্থের দাপট কমানোর দারুণ সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

কিন্তু ২০১৫ সালে ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটারের কাছ থেকে বিতর্কিতভাবে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। ফুটবল থেকে আট বছরের জন্য নির্বাসিত হন এক সময়ের এই নায়ক। পরবর্তীতে আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, ফুটবলের নীতি-নির্ধারণী মহলে নিজের হারিয়ে যাওয়া মর্যাদা আর ফিরে পাননি তিনি।

মাঠের সেই কালজয়ী ১০ নম্বর জার্সিধারী জাদুকর আর প্রশাসনিক ক্ষমতার মারপ্যাঁচে বিদ্ধ হওয়া পরাজিত আমলা – এই দুই চরিত্র মিলেই মিশেল প্লাতিনি। ক্ষমতার মোহ আর রাজনীতির ধূলিঝড় পেরিয়ে ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন এক অনন্য সুরস্রষ্টা হিসেবেই, যাঁর ফ্রি-কিক নেওয়ার ভঙ্গিমায় লুকিয়ে থাকত শিল্পের নিখুঁত ছোঁয়া।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link