কামিন্স, স্টার্ক আর হ্যাজেলউডের নাম শুনলে যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপ ভেবেচিন্তে ক্রিজে নামে। ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আর ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, দুটোই এই তিনজন একসঙ্গে জিতেছেন। ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে ২৫ টেস্টে তাঁদের উইকেট ৩০৬টি, গড় ২৬.৭৫। তুলনায় আসে অস্ট্রেলিয়ারই আগের কিংবদন্তি ত্রয়ী ম্যাকগ্রা, গিলেস্পি ও ব্রেট লি, যাঁরা একসঙ্গে ২২ টেস্ট খেলে জিতেছিলেন ১৫টি। অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের সোনালি সময় তাঁদের হাত ধরেই এসেছিল।
অন্যদিকে বাংলাদেশ একসময় ছিল স্পিননির্ভর দল, স্পিনাররা টার্ন পেলে তবেই বোলারদের কিছু করার থাকত। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলিং বলতে স্পিনকেই ধরা হতো। এর যথেষ্ট কারণও ছিল, নিয়মিত দেশের হয়ে বিশেষ কিছু করা বোলারদের তালিকায় পেসারদের নাম থাকত না বললেই চলে। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পুরো টেস্ট সিরিজে পেসাররা বল করেছিলেন মাত্র ৩১ ওভার। তার মধ্যেও মাশরাফি মুর্তজা, রুবেল হোসেন আর তাসকিন আহমেদরা লড়ে গেছেন, স্পিনারদের ভিড়েও নিজেদের নাম উজ্জ্বল করার চেষ্টা করে গেছেন। মাশরাফির ৭৮ টেস্ট উইকেট আজও বাংলাদেশি পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
হাওয়া বদলাল ২০২৪ থেকে, রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে ২-০তে হারানো সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে প্রতিপক্ষের এক ইনিংসের ১০টি উইকেটই নেন পেসাররা, যা বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে প্রথম। হাসান মাহমুদ নেন ৫ উইকেট, নাহিদ রানা ৪ উইকেট, তাসকিন আহমেদ নেন একটি উইকেট। এই বছর আগস্টে ডারউইনে হাসান এক ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচে মোট ৯ উইকেট পান, বাংলাদেশ জেতে ৯ উইকেটে। ম্যাকায়তে দুই দিনেই ইনিংস ব্যবধানে হারলেও শরিফুল ইসলাম এক ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে হাসানের রেকর্ড ভেঙে দেন।

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তিনজন একসঙ্গে খেলতেই পারেননি। ইনজুরির কারণে নাহিদ পুরো সিরিজের বাইরে ছিলেন, শরিফুল হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের জন্য ডারউইনে খেলেননি। তিনজনকে শেষবার একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডির প্রথম টেস্টে। তাই এই তুলনা রেকর্ডের নয়, বোলিংয়ের ধরনের।
তিনজনের বোলিং এক ছাঁচের নয়, আর এটাই অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়ীর সঙ্গে সবচেয়ে বড় মিল। কামিন্স ২০২৩ সালে বলেছিলেন, তাঁরা চান প্রত্যেক বোলার একটু আলাদা ধরনে বল করুক।
হাসান মাহমুদ খেলেন সিম পজিশন আর লাইন-লেন্থ নিয়ে। অফ স্টাম্পের বাইরের করিডরে আউটসুইংগারে টোপ দেন, ওবল সিমে ব্যাটারকে ড্রাইভে টানেন। এটা হ্যাজেলউডের ঘরানা, যদিও হ্যাজেলউড হার্ড লেন্থে বল ফেলে বাড়তি বাউন্স আদায় করেন, আর হাসান ফুলার লেন্থে সুইং মেশান। এ বছর ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের চার ম্যাচে ২৬ উইকেট নিয়ে নজর কেড়েছেন।

নাহিদ রানার কাজ ব্যাটারকে গতি দিয়ে টেনশনে ফেলা। শর্ট লেগ আর ফাইন লেগে ফিল্ডার বসিয়ে বাউন্সার, হিট দ্য ডেক করে বাড়তি বাউন্স। রাওয়ালপিন্ডিতে তিন ওভারে বাবর, মাসুদ আর শাকিলকে ফিরিয়েছিলেন। বাউন্সারকে অস্ত্র বানানোর দিক থেকে তিনি কামিন্সের ঘরানার। ক্রিকভিজের হিসাবে অভিষেকের পর টেস্টে তাঁর গড় গতি ঘণ্টায় ১৪১.৫৪ কিমি, আর অস্ট্রেলিয়ার মিশেল স্টার্কের ১৪১.০৪।
শরিফুল বাঁহাতি অ্যাঙ্গেল থেকে বল ভেতরে ঢোকান, ঠিক স্টার্কের মতো। ম্যাকায়তে হেডকে সিম-ইনে আউট করেছেন, গ্রিনকে লেট সুইং করা ইয়র্কারে এলবিডব্লিউ। উচ্চতার কারণে তাঁর রিলিজ পয়েন্টও ব্যাটারদের জন্য আলাদা সমস্যা। তাই ব্যাটারকে চমকে দিতে ভালোবাসেন তিনি।
হাসান লাইন-লেন্থে চাপ ধরে রাখেন, নাহিদ গতি আর বাউন্সে তাড়া করেন, শরিফুল বাঁহাতি অ্যাঙ্গেলে চমকে দেন। হাসানের ১৬ টেস্টে উইকেট ৪৫টি, নাহিদ রানা ১২ টেস্টে ৩৮ উইকেট পেয়েছেন, আর শরিফুলের ১৪ টেস্টে ৩৪ উইকেট।

রেকর্ডে অস্ট্রেলিয়ার দুই ত্রয়ীর ধারেকাছে যেতে অনেক পথ বাকি। আসল পরীক্ষা তিনজনকে সুস্থ রেখে সিরিজের পর সিরিজ একসঙ্গে খেলানো, যেটা সহজ নয়। তবু ২০১৬ সালে যে দলের পেসাররা পুরো সিরিজে বল করেছিলেন মাত্র ৩১ ওভার, সেই দলের তিন পেসারকে আজ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে।
ইনজুরি সামলে লম্বা পথ হাঁটতে পারলে বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতেই পারে, এই তিনজনই হবেন দেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা পেস ত্রয়ী।












