ফুটবল হার মানায় যেখানে, সেখানেই রবার্ট পিরেস

বুড়োদের আড্ডায় কিংবা হাইবারির স্মৃতিকাতর গ্যালারিতে যখনই আর্সেনালের সোনালী দিনগুলোর কথা ওঠে, পিরেসের নামটা ভেসে ওঠে খুব মৃদু বাতাসে ছুঁয়ে যাওয়া কোনো চেনা সুরের মতো।

২০০৪ সালের অ্যানফিল্ড। লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচের তখন শেষ মুহূর্ত। বক্সের বাইরে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে চিপ করে বল জালে জড়ালেন রবার্ট পিরেস। আর্সেনালের সেই জয়টি কেবল তিন পয়েন্ট এনে দেয়নি, বরং প্রমাণ করেছিল এই ফ্রেঞ্চ উইঙ্গারের কাছে ফুটবল শুধুই বল পায়ে দৌড় নয়, এক নিখাদ শিল্প।

১৯৭৩ সালের ২৯ অক্টোবর ফ্রান্সের রেইমস শহরে জন্ম রবার্ট পিরেসের। পর্তুগিজ পিতা এবং স্প্যানিশ মাতার সন্তান হওয়ার সুবাদে তাঁর রক্তে মিশে ছিল লাতিন ফুটবলের উষ্ণতা আর ইউরোপীয় ধারার শৃঙ্খলা। স্থানীয় ক্লাব এফসি রেইমস-এর যুব একাডেমিতে ফুটবল হাতেখড়ি নেওয়া পিরেস ১৯৯৩ সালে পা রাখেন মেটজ এর মূল দলে।

​মেটজের জার্সিতেই তাঁর প্রথম বড় সাফল্যের দেখা মেলে। ১৯৯৬ সালে ফ্রেঞ্চ লিগ কাপ জয়ে রাখেন অনন্য ভূমিকা। এরপর মার্সেইয়ের হয়ে ফ্রেঞ্চ ফুটবলে নিজের জাত পুরোপুরি চেনান। ১৯৯৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি স্কোয়াডের সদস্য হওয়া এবং দুই বছর পর ইউরো ২০০০ জয়ে ফ্রান্সের জার্সিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুবাদে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে চলে আসেন পিরেস।

২০০০ সালে আর্সেন ওয়েঙ্গারের হাত ধরে আর্সেনালে পা রাখেন পিরেস। বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে চলে যাওয়া মার্ক ওভারমার্সের শূন্যস্থান পূরণ করা সহজ ছিল না, কিন্তু পিরেস শুধু সেই শূন্যস্থান পূরণই করলেন না, হাইবারি স্টেডিয়ামের দর্শকদের উপহার দিলেন ইতিহাস সেরা কিছু মুহূর্ত।

​ডান পায়ের কারুকার্য, উইং ধরে দারুণ গতি, আর নিখুঁত প্লেসমেন্টে গোল করার সহজাত ক্ষমতা তাঁকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা তারকায় পরিণত করে। ২০০১-০২ মৌসুমে মাত্র ২৮ ম্যাচে নয় গোল ও ১৫ অ্যাসিস্ট করে জিতে নেন  পিএফ এর ‘প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার।

২০০৩-০৪ মৌসুম প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে আর্সেনালের অপরাজেয় থাকার সুবাদে। পুরো লিগ মৌসুমে একটি ম্যাচেও হারেনি আর্সেনাল। সেই ঐতিহাসিক দলের প্রাণভোমরা ছিলেন রবার্ট পিরেস। থিয়েরি অঁরি, ডেনিস বার্গক্যাম্প এবং প্যাট্রিক ভিয়েরায়ে ঘেরা সেই সোনালী স্কোয়াডে পিরেসের বাঁ প্রান্তের আক্রমণ প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই মৌসুমে তিনি করেন ১৪টি গোল।

​আর্সেনাল অধ্যায় চুকিয়ে স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালের হয়ে লা লিগায় চার বছর চমৎকার কাটিয়েছেন পিরেস। এরপর ক্যারিয়ারের শেষ দিকে অ্যাস্টন ভিলা এবং ভারতের ইন্ডিয়ান সুপার লিগে এফসি গোয়ার জার্সিতেও মাঠ মাতিয়েছেন। ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বুটজোড়া তুলে নেন এই ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড।

বুড়োদের আড্ডায় কিংবা হাইবারির স্মৃতিকাতর গ্যালারিতে যখনই আর্সেনালের সোনালী দিনগুলোর কথা ওঠে, পিরেসের নামটা ভেসে ওঠে খুব মৃদু বাতাসে ছুঁয়ে যাওয়া কোনো চেনা সুরের মতো। ঘাস ছোঁয়া পাস আর বক্সে ঢুকে পড়ার সেই চাতুর্য হয়তো আজ কেবলই ভিডিও আর্কাইভের সম্পদ, কিন্তু ফুটবল নামক খেলায় শিল্পের যে সুবাস তিনি ছড়িয়ে গেছেন, তার মেয়াদ ফুরোবার নয়।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link