তিলে তিলে ধ্বংস হয়েছে ইতালির ফুটবল

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্য এটা শুধু ব্যর্থতা নয়—এটা পরিচয়ের সংকট। ফিরে আসা কি সম্ভব?

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবার পড়েছে শঙ্কার মুখে। ইতালির হারানো গৌরব এখন ধুলোর মাঝে লুটোপুটি খাচ্ছে। অথচ একটা সময়ে চার বিশ্বকাপ, অগণিত কিংবদন্তি, আর ‘আজ্জুরি’ নামটার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ মানদণ্ড। কিন্তু সময় এখন নির্মম বাস্তবতা সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ইতালিয়ান ফুটবলকে।

২০২৬ বিশ্বকাপের আগে দাঁড়িয়ে আবারও প্রশ্ন উঠছে—ইতালি কি টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ মিস করতে চলেছে? এই প্রশ্নের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১৪ সালের ব্রাজিলে। ডিয়াগো গোদিনের সেই হেডার— যা গ্রুপ পর্বেই চেজারে প্রানদেল্লির ইতালিকে বিদায় জানিয়ে দেয়। সেদিন কেউ ভাবেনি, সেটাই হয়ে থাকবে বিশ্বকাপের মঞ্চে চারবারের চ্যাম্পিয়নদের শেষ স্মৃতি।

এরপর কেটে গেছে ১১ বছর। আর এই ১১ বছরে ইতালিয়ান ফুটবল শুধু হারিয়েছে মর্যাদা, ধারাবাহিকতা আর নিজেদের পরিচয়। ক্রমে তাদের যাত্রা ধাবমান অন্ধকার এক ভূবনের পানে। ২০১৭ সালে সুইডেনের বিপক্ষে প্লে-অফ হেরে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয় ইতালি- ৫৯ বছরের মধ্যে প্রথমবার।

সেটাকেই সবাই ধরে নিয়েছিল ‘তলানি’। কিন্তু পাঁচ বছর পর নর্থ মেসিডোনিয়ার কাছে হার সেই ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করে দেয়। কাতার বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভাঙে আরও নির্মমভাবে। তবুও ফুটবল পরিহাস করতে ভালোবাসে।

এই দুই ব্যর্থতার মাঝেই, ২০২১ সালে রবার্তো মানচিনির নেতৃত্বে ইউরো জিতে নেয় ইতালি। ১৯৬৮ সালের পর প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা। ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টাইব্রেকারে চ্যাম্পিয়ন আজ্জুরিরা। অনেকে ভেবেছিল- এটাই নতুন ইতালির শুরু। আধুনিক, আক্রমণাত্মক, আত্মবিশ্বাসী এক জাতীয় দল। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, ইউরো জয় ছিল নিছক এক ফ্লুক।

২০২৩ সালের আগস্টে আচমকা মানচিনির বিদায়। দায়িত্ব পান লুচিয়ানো স্পালেত্তি—গত দুই দশকের অন্যতম সেরা ইতালিয়ান কোচ। কিন্তু তাঁর হাতেও বদলায়নি ভাগ্য। ইউরো ২০২৪-এ রাউন্ড অব সিক্সটিন থেকেই বিদায়, প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। মাঠের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক, দিশাহীন।

এরপর নেশনস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেও ছিটকে পড়ে দল। তারপর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শুরুটা যেন শেষের ট্রেইলার! নরওয়ের কাছে ৩-০ গোলে হার, মলদোভার বিপক্ষে কোনোমতে জয়। ফলাফল- স্পালেত্তির বিদায়, দায়িত্ব পান রিনো গাত্তুসো। এখন গাত্তুসোর সামনে প্রায় অসম্ভব মিশন প্লে-অফে না গিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করা।

এই দীর্ঘ পতন কি শুধু কিছু খারাপ ম্যাচের ফল? না। এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। হয়তো ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ মিস করার সময়ের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ তখন সংকট ছিল সাময়িক, এখন তা কাঠামোগত। ইতালি পিছিয়ে পড়েছে আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে তাল মেলাতে। ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন, শারীরিক সক্ষমতা, গেমের গতি—সবখানেই আজ্জুরিরা পিছিয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে অন্য জায়গায়। ইতালি হারিয়েছে নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি, ‘প্রতিভা গড়ে তোলার ক্ষমতা’।

২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপ জয় ছিল এক প্রজন্মের চূড়ান্ত সাফল্য—বুফন, নেস্তা, কান্নাভারো, পিরলো, তোত্তি, দেল পিয়েরো। কিন্তু সেই ট্রফিটাই ছিল এক যুগের শেষ চিহ্ন। এরপর জাতীয় দল যেমন পিছিয়েছে, তেমনি ইউরোপেও হারিয়েছে ইতালিয়ান ক্লাবগুলোর আধিপত্য। ২০০৭ সালে এসি মিলানের সাফল্য, ২০১০ সালে ইন্টারের ট্রেবল—এর পর থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা ক্লাব বিশ্বকাপে কোনো ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন নেই। হ্যাঁ, ফাইনাল উঠেছিল ক্লাবগুলো, জুভেন্টাস, ইন্টার, রোমা, আতালান্তা, কিন্তু ধারাবাহিক আধিপত্য নেই।

প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে তুলনা এখন অর্থহীন। ইংল্যান্ড সময়মতো বুঝেছে টিভি স্বত্ব আর বৈশ্বিক বিনিয়োগের বিপ্লব। তারা ক্লাবকে বানিয়েছে ব্যবসা- স্টেডিয়াম, ব্র্যান্ড, বিনোদন সব মিলিয়ে। ইতালিতে উল্টো চিত্র। টিভি সত্ত্বের টাকার বন্যা এলেও তা খরচ হয়েছে স্বল্পমেয়াদী প্রকল্পে।

স্টেডিয়াম আধুনিক হয়নি, একাডেমি অবহেলিত থেকেছে। এর সঙ্গে যোগ হয় ১৯৯৬ সালের বসম্যান রুলিং। বিদেশি খেলোয়াড়ে ভরে যায় লিগ। একাডেমিগুলোতে স্থানীয় প্রতিভা নয়, গুরুত্ব পায় সস্তা ও সহজ অপশন। কোচরাও ফলাফলের চাপে পড়ে ‘খেলোয়াড় গড়া’ ভুলে যান।

ফলাফলটা আজ সবার সামনে, এক সময় যে ইতালি বিশ্বকে পথ দেখাত, আজ সে নিজেই দিশেহারা। ২০২৬ বিশ্বকাপে না খেলতে পারলে, এই নির্বাসন দাঁড়াবে ১৬ বছরে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্য এটা শুধু ব্যর্থতা নয়—এটা পরিচয়ের সংকট। ফিরে আসা কি সম্ভব?

Share via
Copy link