বিশ্বকাপের মঞ্চে আলোটা সাধারণত চলে যায় গোলদাতাদের দিকে। শিরোনাম হয় ভিনিসিয়াস জুনিয়রের জোড়া গোল, আলোচনায় থাকে ব্রাজিলের দাপুটে জয়। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেক নায়কের গল্প— অ্যালিসন বেকারের গল্প। একজন গোলরক্ষকের গল্প, যিনি বিশ্বকাপের জন্য নিজের ক্লাব ক্যারিয়ারেও ছাড় দিতে দ্বিধা করেননি।
৩৩ বছর বয়সী অ্যালিসন নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে শতভাগ ফিট থাকার জন্য তিনি লিভারপুলের কয়েকটি ম্যাচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। কারণ ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করার অর্থ সমালোচনার মুখে পড়া। কিন্তু অ্যালিসনের কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের জার্সি। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে নিজের সেরাটা দেওয়ার লক্ষ্যেই নিয়েছিলেন সেই কঠিন সিদ্ধান্ত।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে অবশ্য তাকে খুব একটা ব্যস্ত থাকতে হয়নি। ব্রাজিলের একচেটিয়া আধিপত্যে স্কটিশরা গোলমুখে তেমন কোনো হুমকি তৈরি করতে পারেনি। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম গ্লোবো তাই তাকে আখ্যা দেয় ‘লাক্সারি স্পেক্টেটর’— অর্থাৎ বিলাসবহুল দর্শক।
কিন্তু বিশ্বমানের গোলরক্ষকদের আসল পরিচয় মেলে ঠিক এমন ম্যাচেই।
দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পরও তারা মনোযোগ হারান না। ম্যাচের একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো গল্প, আর সেই মুহূর্তের জন্যই তারা প্রস্তুত থাকেন।
দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ড যখন ম্যাচে ফেরার চেষ্টা শুরু করল, তখনই সামনে এলেন অ্যালিসন। স্কট ম্যাকটোমিনের জোরালো হেডার দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর আরও একটি বিপজ্জনক হেডার রুখে দেন নিশ্চিত গোল হওয়ার আগেই। ম্যাচের শেষ দিকে কাছ থেকে নেওয়া একটি নিচু শটও নিরাপদ হাতে আটকে দেন ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। স্কোরলাইন ৩-০ হলেও, অ্যালিসনের সেই সেভগুলোই নিশ্চিত করেছে ব্রাজিলের ক্লিনশিট।

তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েছে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমও। ইএসপিএন ব্রাজিল ম্যাকটোমিনের হেডার ঠেকানো সেভটিকে আখ্যা দিয়েছে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ হিসেবে। অন্যদিকে গ্লোবো দিয়েছে ১০-এর মধ্যে ৭ রেটিং। সংখ্যাটা হয়তো খুব চোখে পড়ার মতো নয়, কিন্তু পুরো ম্যাচে অ্যালিসনের কাজও ছিল সীমিত। তবুও যখনই ব্রাজিলের তাকে প্রয়োজন হয়েছে, তিনি ছিলেন নির্ভুল।
মজার বিষয় হলো, ম্যাচের আগেই স্কটল্যান্ড অধিনায়ক এবং লিভারপুলে অ্যালিসনের দীর্ঘদিনের সতীর্থ অ্যান্ডি রবার্টসন তার প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের বিপক্ষে খেলতে হবে তাদের। নব্বই মিনিট শেষে সেই কথারই যেন প্রমাণ মিলল। কারণ স্কটল্যান্ড যখনই আশা দেখেছে, শেষ দেয়াল হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছেন অ্যালিসন।
ভিনিসিয়াস জুনিয়রের জোড়া গোল শিরোনাম হয়ে থাকবে, নেইমারের প্রত্যাবর্তনও আলোচনায় থাকবে। কিন্তু ব্রাজিলের এই ক্লিনশিটের গল্প লিখতে গেলে আরেকটি নাম বারবার ফিরে আসবে।
তিনি অ্যালিসন বেকার।

যে গোলরক্ষক বিশ্বকাপের জন্য ক্লাবের ম্যাচ ত্যাগ করেছিলেন। আর এখন সেই বিশ্বকাপেই প্রমাণ করছেন, ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রহরীদের একজন এখনও তিনিই।











