রাজপুতরা হার মানে না। যতদিন বেঁচে আছি, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ছোট রবীন্দ্র জাদেজার এই কথাটা খুব মনে ধরেছিল। বাবার মুখে শুনেছিলেন। যদিও দারোয়ান বাবার কথাকে তখন কেউ গুরুত্ব দেয়নি, শুধু ছোট্ট রবীন্দ্র মনোযোগ দিয়ে শোনত।
১৯৯৮-৯৯ সালে গুজরাতের নবগ্রামক্ষেত এলাকায় ছোট্ট সরকারি কক্ষেই থাকতেন পাঁচজন। মা হাসপাতালে নার্স, বাবা ওয়াচম্যান। পরিবার চালাতে খুব কষ্ট। ছোট রবীন্দ্র ক্রিকেটে মন দিলেও সংসারের দায়-দায়িত্ব তার উপর চাপছিল।
২০০৫ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মা মারা যান। ১৭ বছর বয়সে সব স্বপ্ন ভেঙে যায়। কিন্তু রবীন্দ্র হাল ছাড়েননি। বাবার শিখানো বীজমন্ত্র মনে রেখে, মায়ের স্বপ্ন পূরণে নিজেকে ক্রিকেটে সমর্পণ করলেন। বড় দিদি নয়না সহায়তায় শুরু হয় নতুন লড়াই।

পাড়া ক্রিকেট থেকে অনূর্ধ্ব ১৯ ভারতীয় দল, তারপর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ধাপ ধাপে জায়গা করে নেন তিনি। ২০১২ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিনটি ট্রিপল সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন।
জাতীয় দলে অভিষেক হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। প্রথম ওয়ানডে ম্যাচেই অপরাজিত ৬০ রান। কঠিন সময়ে হাল ছাড়েননি। অনেকে তাঁকে সমালোচনা করলেও, ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের কারণে জয়ী হন। অথচ, তাঁকেই ‘স্যার’ জাদেজা বলে ট্রল করত ভারতবর্ষ। সেই সমালোচনা এক নিমিষে উড়িয়ে দেন জাদেজা।
জাদেজা শুধু ব্যাট ও বলেই নয়, ফিল্ডিং, আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা—সবেতেই সেরা। তিনি ভারতের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। ২০১৩ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গোল্ডেন বোল জয় করেন। টেস্ট ও ওয়ানডেতে অনবদ্য পারফরম্যান্সে দেশের জয় নিশ্চিত করেন।

ক্রিকেট ছাড়াও ঘোড়সওয়ারি ও লাঠিখেলা তাঁর নেশা। বাবা অনিরুধের শিখানো জীবনমন্ত্র, ‘লড়াই ছাড়বে না, আমরা রাজপুত’, এখনও তাঁর জীবনের মূল প্রেরণা।
আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে খেলেছেন। সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে ক্রিকেট বিশ্বে নিজের স্থান পাকা করেছেন। ২০১৬ সালে বিয়ে, ২০১৭ সালে কন্যাসন্তান। ২০১৯ সালে অর্জুনা অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
ক্রিকেট বিশ্বে অনন্য হয়ে উঠেছেন তিনি। আইপিএল জিতেছেন একাধিকবার, ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছেন, আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে শ্রেষ্ঠত্ব এনেছেন। ‘স্যার’ বা ‘লর্ড’ নামের ট্রলের শিকার হওয়া এখন অতিত।

দারিদ্র্য, বঞ্চনা, মায়ের মৃত্যু—কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। রবীন্দ্র জাদেজা, ‘স্যার জাড্ডু’, এখন ভারতীয় ক্রিকেটের এক অমর নায়ক। প্রতিটা ম্যাচে, প্রতিটা সেলিব্রেশনে তিনি প্রমাণ করেছেন—লড়াই কখনও শেষ হয় না।










