অবাধ্য ঝড়ের বিষাদ

অ্যাস্টলের প্ৰিয় প্রতিপক্ষ বাছতে বসলে ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাশাপাশি ভারতের নামটা আসবেই। ওয়ান ডে ক্যারিয়ারের ১৬টা সেঞ্চুরির মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধেই যে করেছেন পাঁচটা। শ্রীলঙ্কায় ২০০১ এর ত্রিদেশীয় সিরিজে ভারতের বিরুদ্ধে দুটো ম্যাচেই জমকালো সেঞ্চুরি করেছিলেন কিংবা সেই হারারেতে ওয়ানডে অধিনায়কত্বের শেষ ম্যাচে সৌরভ গাঙ্গুলিকে হার উপহার দিয়েছিলো অ্যাস্টলের অপরাজিত ১১৫ রানের একটা মণিমুক্ত খচিত ইনিংস।

ক্রাইস্টচার্চ এর জেড স্টেডিয়াম। আগে যেটা ল্যাঙ্কাস্টার পার্ক নামে পরিচিত ছিল সেই জেড স্টেডিয়াম ২০১১’র ভূমিকম্পে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ড সরকার পুরোপুরি ভেঙে ফেলে। এমনিতে ক্রিকেট, রাগবি, ফুটবল, টেনিস সবরকমই খেলা চলতে থাকা সেই জেড স্টেডিয়ামে ২০১১ সালে ভূমিকম্প হওয়ার বছর নয়েক আগে এক টর্নেডো দেখেছিলো সেবার।

তবে, সেই টর্নেডোতে স্টেডিয়ামের কোনো ক্ষতি হয়নি, সে ঝড় আসলে আছড়ে পড়েছিল স্টেডিয়ামের বাইশগজ থেকে গ্যালারিতে, আর ১৩ মার্চ ২০০২ এর সে ঝড়ের নাম ছিল নাথান অ্যাস্টল। সাড়ে তিন ঘন্টার কিছু বেশি সময় আর ১৬৮ টা বল ছিল সেই ঝড়ের স্থায়িত্ব।

ইংলিশ বোলারদের ওপর মারাত্মক সে ঝড় তুললেও ৫৫০’র মতো অসম্ভব এক টার্গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাস্টল সেদিন জেতাতে পারেননি কিউইদের। কিন্তু ক্রিকেট জগতে সে ঝড়ের প্রভাব ছিল মারাত্মক, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বলে ডাবল সেঞ্চুরি সেদিনই দেখেছিলো ক্রিকেটবিশ্ব। মাত্র ১৫৩ বলে জমকালো ডাবল সেঞ্চুরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দুনিয়াকে।

অ্যাস্টলের তাক লাগানোর শুরু অবশ্য তার বছর ছয়েক আগে থেকেই, ’৯৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি, ভ্যালেন্টাইন্স ডের দিন আহমেদাবাদে ছিল খেলা, বিপক্ষে সেই ইংল্যান্ড ই। কিন্তু মোটেই ভালোবাসা পেলো না আগের বিশ্বকাপের রানার্সরা।

দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করলেন অ্যাস্টল, ম্যাচের সেরার পুরস্কারের অর্থমূল্য তুলে দিলেন ভরত শাহ নামের এক ফুচকা বিক্রেতাকে, আর ঐ বিশ্বকাপে কিভাবে যেন পতনের শুরু ও ঐ ভালোবাসার দিনের পর থেকেই। বাকি বিশ্বকাপের ৫ ম্যাচে করলেন মাত্র ১০টা রান। আহমেদাবাদ মাঠটা বোধহয় বড়ো পছন্দের ছিল অ্যাস্টলের।

২০০৩ এ সেবার ভারত সফরে এসেছে নিউজিল্যান্ড। সেই আহমেদাবাদকে পেয়ে আবারও ঝলসে উঠলো অ্যাস্টলের ব্যাট, প্রথম ইনিংসে অনবদ্য সেঞ্চুরি আর দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৫১ করে ম্যাচ বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা যে ভঙ্গিতে হরভজন – কুম্বলের মতো স্পিনারদের সামলেছিলেন।

স্পিনারদের বিরুদ্ধে পায়ের ব্যবহারে নজর কেড়েছিলেন সবচেয়ে বেশি। এমনিতে কিউই ব্যাটসম্যানরা স্পিনের বিরুদ্ধে খানিক দুর্বলই হন, অ্যাস্টল কিন্তু স্পিনটা খারাপ খেলতেন না, আর ফাস্ট বোলিংয়ের বিরুদ্ধেও ব্যাকফুটে দারুন স্বছন্দ ছিলেন। ব্যাকফুট পাঞ্চ আর স্কোয়ার কাটে দুর্ধর্ষ সব স্ট্রোক বের হতো অ্যাস্টল এর ব্যাট থেকে।

অ্যাস্টল আসলে টেস্ট ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অমন বিধ্বংসী একখানা ইনিংস কিংবা ভারতের স্পিন ফাঁস সামলে দুর্দান্ত ব্যাটিং করলেও টেস্ট ক্রিকেটে তেমন ধারাবাহিকতা কখনোই দেখাতে পারেননি, ফলে টেস্ট দল থেকে বাদ ও পড়েছেন বার কয়েক।

অ্যাস্টলের আসল মেজাজ লুকিয়ে থাকতো ওয়ান ডে ক্রিকেটে। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ওয়ান ডে ব্যাট অ্যাস্টল; কখনো স্টিফেন ফ্লেমিং, কখনো ভায়রা ভাই ক্রেইগ ম্যাকমিলান আবার কখনো ক্রিস কেয়ার্নসকে সাথে নিয়ে বহু ওয়ান ডে তে কিউয়িদের ম্যাচ জিতিয়ে এসেছেন।

অকল্যান্ড, নেপিয়ার, হ্যামিলটনের ছোট মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ৮৭ ম্যাচে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রান করে গেছেন অ্যাস্টল ঘরের মাঠে, ৭ টা সেঞ্চুরি সমেত ৪৫ এর ওপরে গড় নিয়ে। নিউজিল্যান্ড এর পিচ অ্যাস্টলের মিডিয়াম পেসের ক্ষেত্রেও সুবিধা নিয়ে এসেছে। অ্যাস্টল আসলে পার্ট টাইম বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ড এর অন্যতম সেরা অপশনই ছিলেন। ব্যাটসম্যান উইকেটে জমে গেছে, এ অবস্থায় অ্যাস্টলের উইকেট টু উইকেট মিডিয়াম পেস, ছোট ছোট কাটারগুলো ব্রেক থ্রু দিতো তখন দারুণ ভাবেই।

অ্যাস্টলের প্ৰিয় প্রতিপক্ষ বাছতে বসলে ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাশাপাশি ভারতের নামটা আসবেই। ওয়ান ডে ক্যারিয়ারের ১৬টা সেঞ্চুরির মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধেই যে করেছেন পাঁচটা। শ্রীলঙ্কায় ২০০১ এর ত্রিদেশীয় সিরিজে ভারতের বিরুদ্ধে দুটো ম্যাচেই জমকালো সেঞ্চুরি করেছিলেন কিংবা সেই হারারেতে ওয়ানডে অধিনায়কত্বের শেষ ম্যাচে সৌরভ গাঙ্গুলিকে হার উপহার দিয়েছিলো অ্যাস্টলের অপরাজিত ১১৫ রানের একটা মণিমুক্ত খচিত ইনিংস।

বিশ্বকাপে প্রথমবার সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু করলেও ব্যর্থতার রেশ চলেছিল পরের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও, সেবার সব মিলিয়ে ১০০ রানও করতে পারেননি গোটা টুর্নামেন্টে। আফ্রিকার মাটিতে ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে একটা সেঞ্চুরি বা দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অপরাজিত ৫৪ সেবার মানরক্ষা করে অ্যাস্টলের। এরপর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ২০০৭ বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগে হঠাৎই বাইশ গজ থেকে বিদায় জানালেন অ্যাস্টল।

মোটিভেশন পাচ্ছিলেন না আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার জন্য। সে বিশ্বকাপে যদিও পিটার ফুলটনকে দিয়ে অ্যাস্টল শূন্যতা কাটানোর চেষ্টা করেছিল নিউজিল্যান্ড, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ফল পায়নি, আসলে ওয়ানডে ক্রিকেটে কিউই ব্যাটিংয়ে অ্যাস্টল শূন্যতা মার্টিন গাপটিল, রস টেলর, কেন উইলিয়ামসনদের ভিড়ে বোধহয় আজও তাড়া করে যায়, খুঁজে বেড়ায় সেই ৯ নম্বর জার্সিধারীকে, ঠিক যেমন ভাবে ক্রাইস্টচার্চ আজও খোঁজে জেড স্টেডিয়ামকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...