ক্যারিবিয়ান বুড়োর ডাচ স্বপ্ন

বিশ্বকাপ একটা স্বপ্নের মত জায়গা। একজন ক্রীড়াবিদ মাত্রই চান সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করতে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণের সেই মঞ্চ হল বিশ্বকাপ। ক্রিকেটেও এর ব্যতিক্রম হয় না। কে না চায় স্বপ্নের সেই আসরে খেলতে!

বিশ্বকাপ একটা স্বপ্নের মত জায়গা। একজন ক্রীড়াবিদ মাত্রই চান সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করতে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণের সেই মঞ্চ হল বিশ্বকাপ। ক্রিকেটেও এর ব্যতিক্রম হয় না। কে না চায় স্বপ্নের সেই আসরে খেলতে!

যদিও, ক্রিকেট আজো সেই অর্থে কোনো বৈশ্বিক খেলা নয়। কারণ, এবারই তো বিশ্বকাপে অংশ নেবে মাত্র ১০ টি দল। তবে, একটা সময় ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট আসরে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পেত ছোট ছোট ক্রিকেটীয় শক্তিগুলো।

এমনকি তাদের কিছু ছোট ছোট কীর্তিও আছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। এখানে সবার আগেই আসবে নেদারল্যান্ডসের নোলান ক্লার্কের কথা। তিনিই হলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘বুড়ো’ ক্রিকেটার।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজে ১৯৪৮ সালের ২২ জুন জন্মগ্রহণ করেন ক্লার্ক। তবে পরবর্তীতে তিনি নাগরিকত্ব নিয়ে ক্রিকেট খেলেছেন নেদারল্যান্ডসের হয়ে। বিগ হিটিং এই ডান হাতি ব্যাটসম্যান প্রায় ৪৮ বছর বয়সে ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের হয়ে পাঁচটি ম্যাচ খেলেছেন।

ক্লার্ক বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, আমি যদি অস্ট্রেলিয়ায় থাকতাম, তাহলে হয়তো আমার বিশ্বকাপে খেলা সম্ভবই হত না। নেদারল্যান্ডসে ছিলাম বলেই হয়েছে। এখানে প্রতিভা অনেক কম। ওদের একটু প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার মত লোকের ওই সময় খুবই দরকার ছিল।’

ক্লার্ক অবশ্য ক্যারিয়ার শুরু করেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলেই। বার্বাডোজের হয়ে সেই ১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম শ্রেনির অভিষেক হয়। তখন বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। এর মাত্র চার বছর পরই ১৫৯ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেন। সেটা ছিল মাইক ডেনিসের এমসিসি দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের এক ম্যাচ।

ইনিংসটার ব্যাপারে উইজডেন অ্যালমানাক লিখেছিল, ‘ইনিংসটা এতটা পাওয়ারফুল আর আত্মবিশ্বাসী ছিল যা যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের বোলিং আক্রমণের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারবে।’

যদিও, ক্যারিবিয়ানদের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা হয়নি ক্লার্কের। এমসিসির বিপক্ষে ওই ইনিংসের বছর দুয়েক বাদেই নেদারল্যান্ডস চলে আসেন তিনি। একটা কোচিংয়ের চাকরী জুটে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডসে। ড্রাইজ কস্ট নামের এক ব্যক্তির সুবাদে এসেছিল সেই চাকরী। পরবর্তীতে সেই ব্যক্তির সুবাদেই জীবনের মোড় ঘুড়ে যায় ক্লার্কের।

সেই ঘটনায় পরে আসছি।

বার্বাডোজে ওই সময়ে অনেক জনপ্রিয় ছিলেন ক্লার্ক। তবে, ডাচ অঞ্চলে তাঁকে কেউ চেনার প্রশ্নই ওঠে না। ওই জীবনটা তাই মনে ধরে ক্লার্কের। তিনি বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসে কেউ আমাকে চিনতো না। রাস্তায় অপরিচিত কেউ কথা বলতে চাইতো না। ওই জীবনাট আমার ভাল লেগেছিল। বার্বাডোজে রাস্তায় বের হলেই অসংখ্য লোকের কথা কথা বলতে হত। ওটা আমার পছন্দ ছিল না। তবে, নেদারল্যান্ডসে এসে আমি সত্যিকারের শান্তি পাই। সময়টা উপভোগ করি।’

পেশোয়ারে বিশ্বকাপের ম্যাচ। সবার বাঁয়ে নোলান ক্লার্ক।

আশির দশকের কথা। ক্লার্ক তখন নিউ ওরলিন্সে থাকেন। ক্রিকেট ছেড়ে তখন ডেস্ক জব করতেন। ওই সময়ে আবার সেই ড্রাইজ কস্ট নামের ব্যক্তির সাথে দেখা হয়ে যায় তাঁর। তারই সৌজন্যে হারকিউলিস নামের একটি ক্লাবে খেলার সুযোগ পান ক্লার্ক।

এটাই ক্লার্কের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

ডাচদের হয়ে ক্লার্কের অভিষেক হয় ১৯৮৯ সালে, ৪১ বছর বয়সে। সেদিন নেদারল্যান্ডসের ১৭৬ রানের মধ্যে ৭৭-ই এসেছিল তাঁর ব্যাট থেকে। এই সামান্য রান তুলতে সেদিন ব্যর্থ হয় ইংল্যান্ড একাদশ। পিটার রোবাকের নেতৃত্বে খেলতে নেমে ইংলিশরা অ্যালেক স্টুয়ার্ট, নাসের হুসাইন ও ডেরেক প্রিঙ্গলরা দলে থাকার পরও হেরে যায় তিন রানের ব্যবধানে।

এর পরের বছরই নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি ট্রফি। স্বাগতিকরা ছিল অন্যতম ফেবারিট। দু’টি সেঞ্চুরিসহ ৫২৩ রান করে সেবার টুর্নামেন্টের সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন ক্লার্ক। যদিও, ফাইনালে জিম্বাবুয়ে কাছে হেরে ১৯৯২ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন ভেস্তে যায় ক্লার্কের। হেগের ফাইনালে ছয় উইকেটে হারে ডাচরা।

১৯৯৪ সালে কেনিয়ায় ডাচদের পারফরম্যান্স ছিল আরো বাজে। সেমিফাইনালে আরব আমিরাতের কাছে হারে তাঁরা। কিন্তু আইসিসির পরিবর্তিত নিয়মে বিশ্বকাপ খেলে ফেলে। নিয়ম করা হয় প্রথম তিনটি দলকে সুযোগ দেওয়া হবে বিশ্বকাপে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বারমুডাকে হারায় নেদারল্যান্ডস।

এতগুলো বছর অধ্যাবসায়ের পর অবশেষে উপমহাদেশে ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পান নোলান ক্লার্ক। তিনি অবশ্য বলার মত কোনো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩২ রান করলেও গোটা বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৫০ রান। এর মধ্যে ছিল দু’টো ডাক। তবুও তিনি যে কীর্তি গড়ে গেছেন, সেটা আজকের যুগে ভাঙা প্রায় অসম্ভব।

এরপরও লম্বা সময় নেদারল্যান্ডসের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে গেছেন ক্লার্ক। ট্রিপল ভি ক্লাবের হয়ে শেষবার ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন ২০০৫ সালে। তখন বয়স প্রায় ৫৫-৫৬। সেবার করেন ৭৮২ রান। সর্বোচ্চ রান সংগ্রহের তালিকায় ছিলেন পাঁচে। টিম ম্যাকিনটোশ, জর্জ বেইলি কিংবা জর্জ বেইলির চেয়ে খুব পিছিয়ে ছিলেন না।

আজো অবশ্য তিনি খেলাধুলার মধ্যেই আছেন। এখন অবশ্য ক্রিকেট নয়, তিনি গলফে ব্যস্ত। তবে, ঘরোয়া ক্রিকেট হলেই মাঠে ছুটে যান খেলা দেখতে। নেদারল্যান্ডস ক্রিকেটে তাঁর চেয়ে বড় আইকন যে আর নেই!

বিশ্বকাপের মেগা ইভেন্টে কোন দলের অধিনায়কত্ব করা সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হলেন মোহাম্মদ তৌকির। ২০১৫ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ বছর ৬০ দিন বয়সে সংযুক্ত আরব আমিরাত দলের নেতৃত্ব দিয়ে এ রেকর্ড গড়েন তৌকির।

সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জয় করা অধিনায়ক পাকিস্তানের ইমরান খান। ৩৯ বছর ৫ মাস ২০ দিন বয়সে ১৯৯২ বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করেন ইমরান। মজার বিষয় হচ্ছে বিশ্বকাপ জয় করা সবচেয়ে কম বয়সী তিন খেলোয়াড় আকিব জাভেদ (১৯), মঈন খান (২০) এবং মুশতাক আহমেদকে (২১) নিয়ে গড়া পাকিস্তান দলের অধিনায়কত্ব করেন তিনি।

এখনকার নোলান কার্ক।

সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ শিরোপা শিরোপা জয় করা ক্রিকেটার ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোহান কানহাই। প্রথম আসর ১৯৭৫ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। এ সময় কানহাইর বয়স ছিল ৩৯ বছর ৫ মাস ২৬ দিন। অর্থাৎ ইমরান খানের চেয়ে তার বয়স ছিল ছয় দিন বেশি। কানহাইর শেষ ওয়ানডে ছিল ১৯৭৫ আসরের ফাইনাল, ইমরানের শেষ ওয়ানডে ছিল ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনাল।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে সেঞ্চুরি করা খেলোয়াড় শ্রীলঙ্কার তিলকারত্নে দিলশান। ২০১৫ বিশ্বকাপ আসরে অস্ট্রেলিয়ার হোবার্টে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৮ বছর ১৪৮ দিন বয়সে ১০৪ রান করেছিলেন তিনি।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে পাঁচ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শওকত ডুকানবালার। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ আসরে লাহোরে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৩৯ বছর ৪০ দিন বয়সে ২৯ রানে ৫ উইকেট শিকার শিকার করেছিলেন আরব আমিরাতের ডুকানবালা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...