সময় কখনো কখনো একই মাঠে দাঁড় করিয়ে দেয় একই মানুষকে, কিন্তু চরিত্রটা পাল্টে দেয় সম্পূর্ণ। ডারউইনের মাটি সাক্ষী হয়ে রইল এমনই এক গল্পের—যেখানে ২৩ বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে একটি জাতির ক্রিকেট-অধ্যায়, বদলে গেছে হাবিবুল বাশারের নিজের পরিচয়ও।
২০০৩ সালে এই ডারউইনেই বাংলাদেশ নেমেছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, আর সেই দলে ব্যাট হাতে ছিলেন বাশার। ফল ভালো হয়নি—ইনিংস ও ১৩২ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। তবে ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও একটুকরো আলো জ্বালিয়েছিলেন বাশার নিজে—অর্ধশতক তুলে নিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, লড়াইয়ের ইচ্ছাটা তাঁর মধ্যে ছিল। কিন্তু, একজনের সাহস দিয়ে তো আর যুদ্ধ জেতা যায় না। বাকি দল তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারেনি, আর তাই ব্যক্তিগত প্রতিরোধ হারিয়ে গিয়েছিল দলগত ব্যর্থতার স্রোতে।
২৩ বছর পর সেই একই ডারউইন, একই প্রতিপক্ষ—কিন্তু গল্পটা এবার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে হাঁটল। এবার বাশার মাঠে নেই ব্যাট হাতে, তিনি আছেন সিদ্ধান্তের চেয়ারে, বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হিসেবে। মার্চ মাসে এই দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাই ছিল এই অস্ট্রেলিয়া সফরের দল সাজানো। আর সেই পরীক্ষায় তিনি পেলেন এমন একটা ফল, যা তাঁর নিজের খেলোয়াড়ি জীবনেও অধরা ছিল।

এবার আর একা কারও কাঁধে ভর করে থাকতে হয়নি বাংলাদেশকে। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ডার পারফরম্যান্স আর বল হাতে হাসান মাহমুদদের সম্মিলিত আক্রমণ—সব মিলিয়ে গোটা দলটাই যেন একসঙ্গে নি:শ্বাস নিল। ফল, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়, তা-ও ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।
আর এখানেই লুকিয়ে ছিল সবচেয়ে বড় বাজিটা। তানজিদ হাসান তামিম টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় অচেনা এক নাম, মাত্র একটি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে, তা-ও আবার তাদেরই মাটিতে, বাউন্সি ও পেসবান্ধব উইকেটে নামিয়ে দেওয়া—এই সিদ্ধান্ত ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, প্রায় বেপরোয়াও বলা চলে। অনেকেই তাঁকে দেখতেন শুধু সাদা বলের ক্রিকেটার হিসেবে, যাঁর ব্যাটিং টেকনিক লাল বলের কঠিন পরীক্ষায় টিকবে কি না, তা নিয়েই ছিল প্রশ্ন।
এই সিদ্ধান্তটা যদি ব্যর্থ হতো, যদি তানজিদ রান না পেতেন, তাহলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হতেন খোদ বাশারই—একজন অনভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে এমন কঠিন মঞ্চে ঠেলে দেওয়ার দায় তাঁকেই বহন করতে হতো। কিন্তু নির্বাচক হিসেবে বাশার সেই ঝুঁকিটাই নিয়েছিলেন, নিজের অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসের ওপর ভর করে। আর তানজিদ সেই আস্থার প্রতিদান দিলেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করে।
২০০৩-এর বাশার ব্যাট হাতে একা লড়েছিলেন, দল পারেনি তাঁর পাশে দাঁড়াতে। ২০২৬-এর বাশার ব্যাট হাতে নামেননি, কিন্তু যে দলটা তিনি নিজ হাতে গড়েছেন, সেই দলই তাঁর হয়ে লড়ল, তাঁর হয়ে জিতল। একদিন যিনি ছিলেন একলা যোদ্ধা, আজ তিনিই যেন যুদ্ধ জেতার কারিগর।

ডারউইনের সেই একই মাঠে ২৩ বছর আগে যে অসমাপ্ত গল্প রেখে গিয়েছিলেন বাশার, আজ সেটাই যেন সম্পূর্ণ হলো তাঁরই চোখের সামনে—একজন ব্যাটসম্যানের অসমাপ্ত লড়াই থেকে একজন নির্বাচকের পূর্ণাঙ্গ জয়।এখানেই বুঝি বৃত্তটা সম্পূর্ণ হলো, একই মাঠ, একই মানুষ, তবে সম্পূর্ণ নতুন এক পরিণতি নিয়ে।











