আনন্দ-বেদনার অশ্রু ও একজন সুজন

মানুষটিকে বলা যায় পর্দার আড়ালের হিরো। এই মানুষটি বড্ড বেশি কান্না করেন। মুলতানে জয়ের কাছে হেরে কান্না ভেজা চোখটি রুমালে ঢাকলেও ২০২০ এ যখন অনূর্ধ্ব ১৯ দল চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন তিনি আবারো চোখ ভিজিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিলো সাফল্যের কান্না, ছিলো আনন্দের কান্না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অজস্র পদে আছেন বলে অসংখ্য সমালোচনা তাঁকে ঘিরে হতে পারে - তাই বলে তাঁর কান্নাটা মিথ্যা নয়।

অভেদ্য, অপ্রতিরোধ্য দূর্গের সামনে ২২ গজের লড়াইয়ে মেতে উঠেছিল এক সৈনিক। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে হাসিয়েছিলেন কোটি বাঙালি ভক্তদের। এই সৈনিকের হাত ধরে বাংলাদেশ পেয়েছিলো বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম জয়ের স্বাদ। আবার মুলতানে নিজের সর্বোচ্চ উজাড় করেও কান্নায় ভাসিয়েছিলেন দু-চোখ। আজকের গল্পটা সেই মানুষের।

১৯৭১ সাল; বাবা-মায়ের কোলে আলো হয়ে এসেছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানেই হয়েছিলো ছেলেটির জন্ম। যিনি সময়ের সাথে সাথে ক্রিকেটকে মনে প্রাণে ধারণ করে এগিয়েছেন সামনের দিকে। সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান আর নেই, এখন স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। আর সেই ছেলেটি লাল-সবুজের জার্সিতে বধ করেছে পাকিস্তানকে।

অবশ্য বড় দুই ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই ক্রিকেটে পা দিয়েছিলেন সেদিনের ছোট্ট ছেলেটি। তবে, বড় দুই ভাইয়ের মতো ক্লাব ক্রিকেটে রাজত্ব চালানো তার পছন্দ হয়নি। তার লক্ষ্য ছিলো লাল-সবুজের জার্সিতে ২২ গজ মাতানোর। হ্যাঁ, সে পেরেছে; পেরেছে লাল-সবুজের জার্সিতে রাজত্ব করতে।

শুধু তাই নয়, এই মানুষটির হাত ধরেই বাংলাদেশ পেয়েছিলো একজন গতিময় পেসার, তিনি মাশরাফি বিন মুর্তজা। আবার ব্যাট হাতেও শটের অভাব পূরণ করেছেন অসংখ্য। এই মানুষটি ক্রিকেট মাঠে হারার আগে হারতে শেখেননি। শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। তিনি বাংলাদেশের তরুণদের শিখিয়ে গেছেন কিভাবে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে হয়!

এই মানুষটিকে বলা হয় বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের সর্বকালের সেরা চরিত্র, একই সাথে কখনো কখনো তিনি ঘোরতর বিতর্কিতও বটে। মিরপুর পাড়ায় ‘চাচা’ নামেই পরিচিত এখন সবার কাছে। মাঠে কিংবা ড্রেসিংরুমে, ক্রিকেটারদের আস্থার জায়গা তিনি। আমার একালের দর্শকদের কাছে স্রেফ ‘ট্রল’ ম্যাটেরিয়াল। এইসব নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব গতিতে।

তাঁকে নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় নানান গল্প, লিখতে হবে মহাকাব্য। যেখানে থাকবে একেকটি সাফল্যের গল্প গাঁথা। আমি এতো কিছু বলতে চাইনা। আমি শুধু তার ক্রিকেটীর ক্যারিয়ারের দুইটি স্মরণীয় স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে চাই।

  • ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নায়ক বনে যাওয়া

সময়টা ৩১ মে ১৯৯৯ সাল; অপ্রতিরোধ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে ২২ গজের লড়াইয়ে মেতে উঠেছিলো বাংলাদেশ। আর সেই লড়াইয়ের মধ্যমণি ছিলেন ১০ নাম্বার জার্সি পরিহিত একজন মানুষ। যিনি ব্যাট হাতে দলকে এনে দিয়েছিলেন সম্মানজনক পুঁজি। কিন্তু সেটাই যে জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিলো সেটি তিনি নিজেই বল হাতে প্রমাণ করেছিলেন সেদিন।

কেননা, শক্তিশালী পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে দারুণ লাইনে বল করে দিশেহারা করেছিলো পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের। সেদিন ১০ ওভার হাত ঘুরিয়ে ২ মেইডেন সহ মাত্র ৩১ রানে শিকার করেছিলো ৩ উইকেট। সেই সাথে বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেওয়ার নায়ক বনে গেছিলেন সেদিন।

  • ২০০৩ সালের কান্না

আবারো প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া ছেলেটি তখন বাংলাদেশকে সাদা পোশাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। মুলতানে তার অসাধারণ বোলিংয়ে দিশেহারা হয়েছিলো পাকিস্তানের সালমান বাট, ইমজামামরা। দুই ইনিংস মিলিয়ে ব্যাট হাতে ২১ রান করা ছেলেটি বল হাতে ছিলো দুর্দান্ত। দুই ইনিংস মিলিয়ে শিকারে পরিণত করেছিলেন ৭ ব্যাটসম্যানকে। বাংলাদেশকে নিয়ে গেছিলো জয়ের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ভাগ্য সহায়ক না হওয়ার কান্না ভেজা চোখটি মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসতে হয়েছিলো মাঠ থেকে।

এবার যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় এই মানুষটি কে! তাহলে আপনার উত্তর হবে মানুষটির নাম খালেদ মাহমুদ সুজন। তবে হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। মানুষটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের লড়াকু এক যোদ্ধা।

আচ্ছা এবার এই মানুষটিকে নিয়ে ক্রিকেট পাড়ায় একটু খোঁজ করা হোক। কি দেখছেন? দেখতে পাচ্ছেন তাকে ‘ট্রলম্যান’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। গতি দানব, গুটিদানব, খামাসু বলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা হচ্ছে। কি আজব জাতি আমরা!

কিন্তু আপনি যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটের খোঁজ নিয়ে থাকেন তাহলে দেখতে পাবেন একজন সুজনের গুরুত্ব। দেখতে পাবেন একজন তরুণ ক্রিকেটার তৈরির কারিগরকে। এই মানুষটি যেনো মনেপ্রাণে ক্রিকেটকে লালিত পালিত করেন, নয়তো কেনই বা নির্বাচক প্যানেলে থাকা সত্বেও ছুটে যাবেন ২২ গজের ক্রিকেটে? যেখানে কাজ করেন তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে। যারা একদিন লাল-সবুজের দেশকে নেতৃত্ব দিবেন!

এই মানুষটির হাত ধরেই তৈরি হয়েছে চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার। এই মানুষটি অনূর্ধ্ব ১৯ চ্যাম্পিয়নদের লড়াইয়েরর জন্য তৈরি করেছেন। এই মানুষটিকে বলা যায় পর্দার আড়ালের হিরো। এই মানুষটি বড্ড বেশি কান্না করেন। মুলতানে জয়ের কাছে হেরে কান্না ভেজা চোখটি রুমালে ঢাকলেও ২০২০ এ যখন অনূর্ধ্ব ১৯ দল চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন তিনি আবারো চোখ ভিজিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিলো সাফল্যের কান্না, ছিলো আনন্দের কান্না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অজস্র পদে আছেন বলে অসংখ্য সমালোচনা তাঁকে ঘিরে হতে পারে – তাই বলে তাঁর কান্নাটা মিথ্যা নয়।

একজন সুজনকে নিয়ে যতই ট্রল হোক না কেনো, কিছু সাফল্য সুজনকে মনে করিয়ে দেয় বারবার। মনে করিয়ে দিয়ে একজন লড়াকু সুজনকে। যিনি কখনো হারার আগে হারতে পছন্দ করেন না। যিনি বাংলাদেশের হয়ে ৮৯ টি আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ব্যাট হাতে ১২৫৭ রানের সাথে বল হাতে শিকার করেছেন ৮০ উইকেট। আসলে পরিসংখ্যান দিয়ে এই মানুষটিকে বিচার করা কিছুটা হলেও অনুচিত। কেননা, বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই মানুষটি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন সবসময়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...