ফ্ল্যামবয়েন্সের আলোর চাদরে ঢাকা ধৈর্যের সাধক

এখানে কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো হঠাৎ উল্লাস নেই। শুধু সময় এগিয়েছে। স্কোরবোর্ডে রান যোগ হয়েছে, সাহস বেড়েছে। সবাই তাতে বিরক্ত হয়, আবার পরক্ষণেই আবিষ্কার করে এভাবেই বাঁচতে হয়, এভাবেই লড়তে হয়।

একশো পঞ্চাশ কোটি মানুষের এক ক্রিকেট বাজার। ক্রিকেট মাঠে। ভারত বহুবার জিতেছে—বিশ্বকাপে, ইডেনে, গ্যাবায়, ওয়াঙখেড়েতে। প্রতিটি জয় ইতিহাস। কিন্তু সব জয় যেমন আলোড়ন তোলে, চেতেশ্বর পূজারা তেমন কেউ ছিলেন না।।

চেতেশ্বর পূজারা ছিলেন নিশব্দ লড়াইয়ের প্রতীক। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ক্রিকেট শুধু ঝলমলে কভার ড্রাইভ বা ঝড়ো ইনিংস নয়। বরং ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর ছোট ছোট অর্জনের নামও ক্রিকেট।

চেতেশ্বর পূজারা ছিলেন রোজকার ডায়েরির হিসেবের খাতা। যেখানে লেখা থাকে বাকি রাখা দেড়শ টাকা, কিংবা ৫০ টাকা কম পড়ার অঙ্ক। নিখুঁত, ধৈর্যশীল, একঘেয়ে। অথচ অমূল্য, কখনও নিখুঁত সমাধান।

অবশ্য, অঢেল সম্পদের পাহাড় থাকলে হিসাবের দরকার কি! ভারতের তাই হয়েছিল। চেতেশ্বর পূজারার জন্য কেউ অপেক্ষা করেনি। বরং তিনি বাদ পড়ে তিনি লড়াই করেছে। বাড়ি ফিরে বিস্তর রান করেছেন। অপেক্ষায় ছিলেন আরেকটা ডাকের, সেই ডাক আদৌ আর আসেনি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট করে যাওয়া পূজারা দেখিয়েছিলেন কীভাবে বোলারদের পরিকল্পনা ভেঙে দেয়া যায়। শরীরে আঘাত নিয়েও স্থির থেকে খেলে যাওয়া, প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়া—এটাই ছিল তার জেতার কৌশল। তাই অনেকের কাছে তিনি ছিলেন একঘেয়ে আর অসহনীয়! কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন ভারতের টেস্ট ক্রিকেটের ভরসা। যতক্ষণ পূজারা খেলতেন, ততক্ষণ ভরসা থাকত।

বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভ, শচীন টেন্ডুলকারের স্ট্রেট ড্রাইভ, অনিল কুম্বলের গুগলি—ওসব ঝলমলে প্রদর্শনী। বিরাট কোহলি যদি টানা পাঁচ বছর রান না করেন, তবুও তিনি দলে থাকেন। কিন্তু পূজারা টানা দুই সিরিজ খারাপ গেলেই বাদ পড়েন।

কারণ, তিনি ঝলমলে নন, তার ব্যাটিংয়ে নেই ‘ফ্ল্যামবয়েন্স’। বর্তমান ক্রিকেটের বাজারে সেটাই টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ফলে আগের সব লড়াই, সব অবদান দল গঠনের মঞ্চে অর্থহীন হয়ে যায় পূজারার সময়।

এবার তিনি বিদায় জানালেন। ৩৭ বছর বয়সে এসে ভারতীয় ক্রিকেটের সব রকম ফরম্যাট থেকে অবসর ঘোষণা করলেন। ১০৩ টেস্ট, ৭১৯৫ রান, ১৯টি শতক আর ৩৫টি অর্ধশতক—এই সংখ্যাগুলো বলে দেবে তার অবদান। সংখ্যাগুলো মহাকাব্য নয়, তবু অনিবার্য। তার শেষ টেস্ট স্মৃতি ২০২৩ সালের ওভাল, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। আর তারপর এই নীরব প্রস্থান।

পূজারা ছিলেন না কোনো পোস্টারের তারকা, তার নাম হয়তো স্লোগানে ধরা দেবে না। কিন্তু তিনি ছিলেন ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের ভিত, যে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে এসেছে সবচেয়ে বড় জয়গুলো। তার অবসর এক যুগের সমাপ্তি, যাকে ভারতীয় ক্রিকেট কিংবা ক্রিকেট বিশ্ব মনে রাখবে নি:শব্দ দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে।

ক্রিকেট ছিল তার কাছে জীবনের লড়াইয়ের মত। ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর পরিশ্রম দিয়ে মাখা। তিনি কখনো ঝড় তোলেননি, কিন্তু নিশ্চিন্তে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়েছেন। তিনি ব্যাট করলে ভারত জিতবেই বলা যেত না, কিন্তু হেরে যাবে না—এই আশ্বাসই ছিল যথেষ্ট।

এখানে কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো হঠাৎ উল্লাস নেই। শুধু সময় এগিয়েছে। স্কোরবোর্ডে রান যোগ হয়েছে, সাহস বেড়েছে। সবাই তাতে বিরক্ত হয়, আবার পরক্ষণেই আবিষ্কার করে এভাবেই বাঁচতে হয়, এভাবেই লড়তে হয়।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link