ফুটবল যখন নিছক এক খেলার সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদস্পন্দনে রূপ নিচ্ছিল, সেই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের পরতে পরতে মিশে ছিল এক বিস্ময়কর অসংগতি। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে এক ঐতিহাসিক ভুল আমাদের চোখের সামনেই সগৌরবে টিকে ছিল, অথচ ফুটবল রোমান্টিকদের আবেগের আতিশয্যে তা হয়তো অদেখাই রয়ে গিয়েছে।
১৯৩০ সালের সেই প্রথম বিশ্বকাপের আবাহন জানাতে তৈরি হয়েছিল এক অনিন্দ্যসুন্দর অফিসিয়াল পোস্টার। গুইলারমো ল্যাবোর্ডের তুলিতে আঁকা সেই আইকনিক শিল্পকর্মে খোদাই করা ছিল বিশ্বকাপের সময়কাল – ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ পাণ্ডুলিপি বলছে এক ভিন্ন গল্পের কথা।
বাস্তবে ফুটবলের সেই আদিমতম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজেছিল ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই। মন্টেভিডিওর ‘পোসিটোস ফিল্ড’ এ যখন ফ্রান্স ৪-১ ব্যবধানে মেক্সিকোকে চূর্ণ করছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করে নিজের নাম অমরত্বের কালিতে লিখেছিলেন লুসিয়েন লরেন্ট।

অন্যদিকে, একই প্রহরে ‘পার্কে সেন্ট্রাল’ স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়ের দর্প চূর্ণ করে ৩-০ ব্যবধানের জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কেবল সূচনালগ্ন নয়, মহাযুদ্ধের সমাপ্তিও ঘটেছিল নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে। ৩০ জুলাই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ‘ভিক্টরি ট্রফি’ উঁচিয়ে ধরে প্রথম বিশ্বজয়ের অমরত্ব পেয়েছিল স্বাগতিক উরুগুয়ে।
কেন এই সময়ের গোলকধাঁধা? ইতিহাসের অন্দরমহলে উঁকি দিলে দেখা যায়, ১৯২৯ সালের মে মাসে ফিফার ১৮তম কংগ্রেসে যখন ইতালি, হাঙ্গেরি ও নেদারল্যান্ডসের মতো পরাশক্তিরা আয়োজক হওয়ার দৌড় থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, তখনই উরুগুয়ের ভাগ্য সুনিশ্চিত হয়। প্রতিনিধি ডঃ এনরিক বুয়েরোর ঐকান্তিক চাওয়ায় তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল ১৫ জুলাই।
কিন্তু ১৯৩০ সালের ৭ জুন বুদাপেস্টের অধিবেশন এক নতুন সংকটের সাক্ষী হয়। ইউরোপের মাত্র চারটি দেশ – বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া ও রোমানিয়া সুদূর আটলান্টিক পাড়ি দিতে সম্মত হয়। দলের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয়োজক কমিটি বাধ্য হয়ে টুর্নামেন্ট এগিয়ে নিয়ে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। ৪ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় নতুন তারিখ, ১৩ জুলাই!

ততদিনে মুদ্রণযন্ত্রের গর্ভ থেকে বেরিয়ে গেছে হাজার হাজার অফিসিয়াল পোস্টার। সময়ের অভাব কিংবা তৎকালীন সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলায় সেই ভুল তারিখ সম্বলিত পোস্টারটিই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফুটবল ইতিহাসের এই অন্যতম বৃহৎ তথ্যগত বিভ্রাটটি দীর্ঘ ৮৬ বছর কারোরই তীক্ষ্ণ নজরে পড়েনি।
ল্যাবোর্ডের তুলি হয়তো সেদিন বাস্তবের তারিখ ছুঁতে পারেনি, কিন্তু ফুটবলের সেই অমর স্পন্দনকে ঠিকই ধরে রেখেছিল। ৮৬ বছর ধরে আড়ালে থাকা সেই ভুলটি আজ ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাকাব্যে এই অশুদ্ধ লিপিই হয়তো সবচেয়ে শুদ্ধতম আবেগ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।











