সেনেগালের ফুটবল বিপ্লব

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু দল হেরে গিয়ে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ২০১৮ সালে সেনেগালের বিদায়টা ছিল বিয়োগান্তক এক প্রহসন।

ফুটবল মহাকাশে প্রতিটি জাতির একটি নিজস্ব কক্ষপথ থাকে। কোনোটি চিরকালই ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, কোনোটি আবার উল্কার মতো আকস্মিক। সেনেগালের ফুটবলীয় বিবর্তন ঠিক এমনই এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু দল হেরে গিয়ে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ২০১৮ সালে সেনেগালের বিদায়টা ছিল বিয়োগান্তক এক প্রহসন। সেদিন মাঠের ফুটবলে নয়, সেনেগাল হেরেছিল ফিফার নিয়মাবলীর এক জটিল সমীকরণের কাছে।

জাপানের সাথে সব সমীকরণ মিলে যাওয়ার পর কেবল ‘হলুদ কার্ড’ বেশি পাওয়ার অপরাধে সেনেগালকে ছিটকে যেতে হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম ‘ফেয়ার প্লে’ ভিত্তিক বিদায়। কোনো ড্রামা নেই, কোনো পেনাল্টি মিস নেই। স্রেফ শৃঙ্খলার এক নির্মম নিয়মে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা একটা জাতির স্বপ্ন।

ফিরে যাওয়া যাক ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে আনকোরা এক সেনেগাল। পাপা বোবা দিওপের সেই আইকনিক গোলটি কেবল একটি জয় ছিল না, ছিল কয়েক দশকের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ফুটবলের এক শৈল্পিক জবাব। সুইডেনকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে বিশ্বকে তারা জানিয়ে দিয়েছিল- আফ্রিকান ফুটবলাররা কেবল অংশ নিতে আসে না, তারা শাসন করতে আসে।

পরবর্তীতে ২০০৬ থেকে ২০১৪ টানা তিন বিশ্বকাপে অনুপস্থিত থাকা সেনেগাল অবশেষে ২০১৮ তে ফেরে। সেই ফেয়ার প্লে ট্র্যাজেডি সেনেগালকে মানসিকভাবে আরও ইস্পাতকঠিন করে তুলেছিল। আলিউ সিসের জাদুকরী ছোঁয়ায় কালিদু কুলিবালি, ইদ্রিসা গানা গেয়ে এবং কিংবদন্তি সাদিও মানেদের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী রক্ষ্যবাহিনী গড়ে ওঠে। ২০২২ সালে মিশরকে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস জয় করে।

কাতারের মাঠে সাদিও মানের চোট যখন পুরো জাতিকে হতাশায় নিমজ্জিত করেছিল, তখনও সেনেগাল প্রমাণ করেছিল তারা কেবল একজনের দল নয়।  মানেকে ছাড়াই তারা নকআউট পর্বে পৌঁছে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তাদের সামষ্টিক শক্তি কতটা শক্তিশালী।

এখন লক্ষ্য ২০২৬। বর্তমান সেনেগাল স্কোয়াডটি অভিজ্ঞতার পাহাড় আর তারুণ্যের জোয়ারের এক অনন্য মিশেল। নিকোলাস জ্যাকসন, পাপে মাতার সার আর লামিন কামারার মতো বিশ্বমানের প্রতিভা নিয়ে তারা এখন আর কেবল চমক দেখানোর অপেক্ষায় থাকা কোনো দল নয়। তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের এক সুসংগঠিত পাওয়ারহাউস।

​সিউলের সেই বজ্রপাত থেকে ২০২৬ এর নতুন সীমান্ত।সেনেগালের যাত্রা এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণের সংকল্প। তেরাঙ্গার সিংহদের গর্জন এখন আর কেবল আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ নেই, তা কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চ।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link