​যে মাটির ধূলিকণায় নিত্য বাঁচে ফুটবল ইতিহাস

বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো মেক্সিকো ফুটবল মহোৎসবের আয়োজক হতে যাচ্ছে। এখানে ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি জীবনবোধ, এটি এক অনন্ত আবেগ।

একটা চামড়ার গোলক কীভাবে গোটা একটা জাতির নিঃশ্বাস হয়ে উঠতে পারে? তা দেখতে হলে তাকাতে হবে মেক্সিকোর দিকে। বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে যা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল মহোৎসবের আয়োজক হতে যাচ্ছে। এখানে ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি জীবনবোধ, এটি এক অনন্ত আবেগ।

১৯৭০ সালের সেই তপ্ত জুন। মেক্সিকো যখন প্রথমবার বিশ্বকাপের দরজা খুলে দিয়েছিল, তখন আসলে তারা উন্মুক্ত করেছিল নিজেদের হৃদয়কে। বিশ্ববাসী মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেছিল পেলে, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারদের পায়ের জাদু। কংক্রিট আর প্রতিধ্বনির মহাকাব্যিক উপাসনালয় ‘এস্তাদিও অ্যাজটেকা’ প্রথমবারের মতো চিনেছিল ফুটবল বিশ্ব, যেখানে পেলের ব্রাজিল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে।

এর ঠিক ১৬ বছর পর, ১৯৮৬ সালে নিয়তি আবারও মেক্সিকোকে বেছে নেয়। ১৯৮৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের ক্ষত তখনও দগদগে, কিন্তু মেক্সিকানদের বুকে ছিল আশা। সেটি স্রেফ ফুটবল ছিল না, ছিল এক বিপর্যস্ত জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর মহাকাব্য। সেখানেই ম্যারাডোনা দেখিয়েছিলেন ইতিহাসের সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ ও সর্বকালের সেরা গোল।

এবারের বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে একদম ভিন্ন ধাঁচের। ৪৮টি দল, ১৬টি গ্রুপ আর ১০৪টি ম্যাচের এক বিশাল যজ্ঞ। মেক্সিকানদের জন্য এটি কোনো সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়, বরং এক আবেগঘন তীর্থযাত্রা। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকা, মনটেরির বিবিভিএ স্টেডিয়াম এবং গুয়াদালাহারার অ্যাক্রন স্টেডিয়াম। এই তিন মঞ্চে এক সুরে স্পন্দিত হবে কোটি প্রাণ।

​মেক্সিকো শুধু গ্যালারি দেয় না, দেয় এক অপার্থিব পরিবেশ। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে ধেয়ে আসে গর্জন। রাস্তা থেকে ভেসে আসে শিশুদের জরাজীর্ণ বলে লাথি মারার শব্দ।সবকিছুতেই যেন এক আদিম ফুটবলীয় সুর জড়িয়ে থাকে।  স্টেডিয়ামগুলোর প্রতিটি ইট, প্রতিটি কোণ যেন একেকটি জীবন্ত গল্প, যা দাদু-নাতিদের আড্ডায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।

​এই ফুটবল-উন্মাদনা গ্রামীণ জনপদের ধূলিময় মেঠো পথ থেকে শুরু করে শহরের বিলাসবহুল স্টেডিয়াম পর্যন্ত সমানভাবে প্রবহমান। এটি মেক্সিকোর নিজস্ব পরিচয়।

​২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ মেক্সিকোর বুকে এক গভীর সামাজিক ও কাঠামোগত ছাপ রেখে যাবে। স্টেডিয়ামগুলোর আধুনিকায়ন দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আগামী কয়েক দশকের জন্য সমৃদ্ধ করবে।  তবে এর চেয়েও বড় উত্তরাধিকার তৈরি হবে মেক্সিকোর কোটি তরুণের মনে। ঘরের মাঠে বিশ্বসেরা তারকাদের খেলতে দেখে হাজারো শিশু স্বপ্ন দেখবে একদিন সেই বিখ্যাত সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর, অ্যাজটেকার মাঠে পা রাখার।

​মেক্সিকো সম্পূর্ণ প্রস্তুত। উৎসবের দামামা বাজছে শহরগুলোতে, মানুষ দুহাত বাড়িয়ে অপেক্ষায়। এই ফুটবলীয় উৎসবে পুরো বিশ্ব আমন্ত্রিত।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link