নিখুঁত ফিনিশিং, এক নিমিষে বল জড়িয়ে গেল গোলপোস্টে। বিশ্বসেরা গোলরক্ষক অলিভার কান বোকার মত বসে রইলেন কেবল। সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইনের সামনে আদতে বিশ্বের সব নামকরা গোলরক্ষক এভাবে বোকার মত তাকিয়ে থাকতেন।
ইতিহাসের সেরা ফুটবলার নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সেই জায়গাটাতে অবধারিত ভাবে একজনের নামই উচ্চারিত হয়। তিনি রোনালদো, দ্য ফেনোমেনেন – ডি বক্সের ত্রাস, গোলরক্ষকদের বুকের কাঁপন বাড়িয়ে দেওয়ার অতিমানবীয় সেই রোনালদো।
ফুটবলের আকাশে অনেক নক্ষত্রেরই আগমন ঘটেছে, কিন্তু কেউ কেউ আসেন ফুটবল খেলাটার সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দিতে। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলের ইতিহাসে রোনালদো নাজারিও ঠিক তেমনি এক অতিমানবীয় চরিত্র, যাকে ফুটবল বিশ্ব একনামে চেনে ‘দ্য ফেনোমেনন’ হিসেবে। ব্রাজিলের ফুটবলীয় অহংকারকে যিনি একক কাঁধে বয়ে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়, তিনি হলেন এই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ‘নাম্বার নাইন’।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মূল দর্শনই হলো ‘জোগা বোনিতো’ বা নান্দনিক ফুটবল। রোনালদো ছিলেন সেই দর্শনের অন্যতম খাঁটি শিল্পী। গতি, শক্তি আর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিংয়ের এমন ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধন ফুটবলের ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। ব্রাজিলের ফুটবলে তাঁর প্রভাব ছিল একচ্ছত্র। পেলের পর হলুদ জার্সির আকাশসম চাপ মাথায় নিয়েও যিনি অবলীলায় সব বাধা জয় করে গেছেন।
ব্রাজিলের প্রতিটি অলিতে-গলিতে ফুটবলার। লাতিন আমেরিকার দেশটিতে শিশুরা যেন ভাষা শেখার আগেই ফ্রি-স্টাইল শিখে ফেলে। সেই সাম্বার দেশেও তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এক ঈশ্বরপ্রদত্ত বরদান হিসেবে। গ্যারিঞ্চা-সক্রেটিসদের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে হলুদ জার্সিতে তিনি যে রাজত্ব গড়েছিলেন, তা ব্রাজিলের ফুটবলীয় অহংকারকে নিয়ে গিয়েছিল এক অনন্য উচ্চতায়।
নব্বইয়ের দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পুরো সাম্বার দেশের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রিত হতো তাঁর পায়ের জাদুতে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি ছিলেন এক আজন্ম মনস্তাত্ত্বিক ত্রাস। কেবল শরীরের মোচড়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডার আর গোলরক্ষকদের বোকা বানানো ছিল তাঁর সহজাত শিল্প। তিনি মাঠে নামা মানেই গ্যালারির গর্জন আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় আনন্দ।

রোনালদোকে ধরা হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত খেলোয়াড় হিসেবে। কোনো প্রকারের তর্ক ছাড়াই তাঁকে মেনে নেওয়া হয় সর্বকালের শ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার হিসেবে। আধুনিক ফুটবলের ছকবাঁধা যান্ত্রিকতার যুগে এসে তাঁর সেই বাঁধভাঙা দৌড় বড্ড বেশি মনে পড়ে।নিষ্ঠুর ইনজুরি যদি বারবার তাঁর পায়ে শিকল না পরাত, তবে ফুটবল রেকর্ডের খাতাগুলো হয়তো তাঁর নামের পাশে এসে নতুন করে বিনম্র চিত্তে দাঁড়াত।
কিন্তু রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল প্রতিভায় নয়, লুকিয়ে ছিল তাঁর অপরাজেয় মানসিকতায়। দু-দুটি ক্যারিয়ার ধ্বংসকারী ইনজুরির পর যখন সবাই তাঁর শেষ দেখে ফেলেছিল, ঠিক তখনই ২০০২ বিশ্বকাপে ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠেন তিনি। ৮ গোল করে ব্রাজিলকে এনে দেন তাদের পঞ্চম ও শেষ বিশ্বজয়ের সোনালী ট্রফি।
রোনালদো নাজারিও কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবলের এক অগ্রনী মহানায়ক। ঈশ্বর যেন নিজেই তাঁকে ফুটবলার বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর দুই পায়ের স্পর্শ পেয়েই যেন ফুটবল নিজের পূর্ণতা লাভ করেছিল।

সামনে আরেকটি বিশ্বকাপ, গ্যালারিতে আবারো জ্বলবে আলো, কিন্তু আধুনিক ফুটবলের অতি-কৌশল আর রোবোটিক খেলোয়াড়দের ভিড়ে আজীবন অপূরণীয়ই থেকে যাবে ‘দ্য ফেনোমেনন’-এর সেই দাঁত বের করা চিলতে হাসি আর নম্বর নাইন জার্সির সেই অতিমানবীয় শূন্যতা।










