শেষ বাঁশি বেজে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সেই বাঁশির শব্দটা বুঝি বিষাদমাখা ভায়োলিনের সুর। যে সুর ক্রমশ ঝাপসা করে দিচ্ছে চারপাশের উৎসব, যে সুর শেষ করে দিচ্ছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নামক মহামানবের দুই দশকের মহাকাব্য। স্পেন বিদায় করে দিয়েছে পর্তুগালকে, তবে এর চেয়ে চরম সত্য, দ্য এন্ড অব অ্যা লিজেন্ডারি এরা, দ্য এন্ড অব ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো চ্যাপ্টার।
২০০৩ সাল, এক আনকোরা তরুণ একবুক স্বপ্ন নিয়ে গায়ে জড়ালো পর্তুগালের জার্সি। বয়স তখন ১৮, কী সব দুঃসাহস উঁকি দিয়েছে তাঁর উঠোনে। কিংবদন্তি হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল সে। ২৩ বছর পর সেই পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত রোনালদো। ডালাসের মাঠ যেন পা জোড়া আটকে রেখেছে ঘাসের সঙ্গে, তারা যেতে দিতে চায় না। তবে সময় যে ফুরিয়ে গেল, যেতে তো হবেই।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন, জীবনের সঙ্গে যুদ্ধটা শেষ হয়েছে। আহত, পরাজিত এক সৈনিকের সেই ফিরে আসার সময় আলো তখনও স্টেডিয়ামের গায়ে ঝলমল করছিল, কিন্তু তাঁর বিশ্বকাপের আকাশে সূর্যটা যে ডুবে গেছে। একদিন এই মানুষটিই পর্তুগালের স্বপ্ন ছিল। তারপর তিনি পর্তুগালের সাহস হলেন। এরপর ইতিহাস। আর শেষ পর্যন্ত, একটা যুগ।
পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতে নিজের নাম লিখিয়েছেন সেরাদের কাতারে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ইউরোপের শীর্ষে তুলেছেন, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে চারবার জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে বার্নাব্যুকে বানিয়েছেন নিজের রাজত্ব। তারপর পর্তুগালের জার্সিতে এনে দিয়েছেন ইউরো ও নেশনস লিগ, যে স্বপ্ন একসময় অসম্ভব মনে হতো।

জাতীয় দলের জার্সিতে ২২০-এর বেশি ম্যাচ, ১৪০-এর বেশি গোল। সংখ্যাগুলো কাগজে লেখা যায়, কিন্তু সেগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা মুহূর্তগুলো লেখা যায় না। শেষ মিনিটের সেই হেড, অসম্ভবকে সম্ভব করা সেই ফ্রি-কিক, হারতে বসা ম্যাচে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলা, “এখনও শেষ হয়নি।” তিনি পুরো বিশ্বের মানসিকতা বদলে দিয়েছিলেন, বদলে দিয়েছিলেন দেখার ভঙ্গি।
এই মানুষটার কাঁধে ভর করেই একটি ছোট্ট দেশ ইউরোপের চূড়ায় উঠেছে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয় নিজের পতাকা ওড়াতে শিখেছে। সেই কাঁধও এবার ক্লান্ত। সময়ের কাছে কখনও কোনো কিংবদন্তি জেতে না। সবচেয়ে উঁচু লাফও একদিন মাটিতে নেমে আসে। সবচেয়ে দ্রুত দৌড়ও একদিন গতি হারায়। সবচেয়ে গর্জনময় স্টেডিয়ামও একদিন নীরব হয়ে পড়ে।
স্পেনের বিপক্ষে পরাজয় তাঁরই এক উপখ্যান। বিশ্বকাপে হয়তো পর্তুগাল খেলবে। নতুন তারকা আসবে। নতুন গোল হবে। নতুন ইতিহাসও লেখা হবে। তবে রোনালদো কি থাকবেন? আকাশ তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে ঠিকই, তবে রোনালদো ঠিকই থাকবেন ঘাসের কাছাকাছি।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যু একদিন তাঁকে বিদায় জানিয়েছিল। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডও একসময় দরজা বন্ধ করেছিল। ক্লাব ফুটবলের প্রতিটি অধ্যায় একে একে শেষের পথে হেঁটেছে। কিন্তু পর্তুগালের জার্সিটা ছিল আলাদা। সেটা ছিল শেষ আশ্রয়, শেষ পরিচয়। সেই অধ্যায়েও পড়ে গেল শেষ দাঁড়ি।

বিদায়ী সুর বেজেছে সেই ছেলেটির জন্য, যে শিখিয়েছিল স্বপ্ন দেখতে হলে হিমালয়ের চূড়ায় চোখ রাখতে হয়, হারার আগে হারতে নেই, জিততে হলে শেষ মিনিট পর্যন্ত ধরে রাখতে হয় বিশ্বাস। তবে এই বিশ্বাসকে ট্রাম্প করেছে বয়স, সবসময় জেতা যায় না, জেতা হয় না। স্রেফ চলে যেতে হয়, কোনো এক অজানা শেষের গন্তব্যে, ঘাড় ঘোরালেই যেখান থেকে দেখা যায় অমরত্ব পেছন থেকে ডাকছে, তবে সেটাও এখন তাঁর চায় না। ওসব পুরোনো আলাপ তাঁর জন্য, রোনালদো এখন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে শুধু, অমরত্বের চেয়ে কি আর বড় কিছু আছে? উত্তরে, কেউ কেউ বলবে বিশ্বকাপ।
Share via:










