ভারতের জার্সি গায়ে প্রথমবারের মতো বল হাতে দাঁড়ালেন যশ ঠাকুর। এটাকে কি নিছক এক আন্তর্জাতিক অভিষেক বলবেন? বাবাকে দেওয়া শেষ প্রতিশ্রুতি পূরণের গল্পকে সাধারণ এক অভিষেক বলা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারাতের রিং থেকে ক্রিকেট মাঠ—এই গল্পটা যে অশ্রু, প্রত্যাখ্যান, ত্যাগ আর অবিশ্বাস্য ধৈর্যের এক দীর্ঘ পথচলার ফলাফল।
যে যশ ঠাকুরকে ভারতীয় দলের নতুন পেসার হিসেবে দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব, তার যাত্রাটা শুরুই হয়েছিল কারাতের রিংয়ে। ক্রিকেটের আশপাশেও ছিলেন না তিনি। যশের বাবা রবি সিং ঠাকুর ছিলেন মহারাষ্ট্রের স্টেট-লেভেল কারাতে চ্যাম্পিয়ন।
স্বাভাবিকভাবেই ছেলেকেও নিজের পথেই হাঁটাতে চেয়েছিলেন তিনি। ছোটবেলায় কারাতেতে দারুণ প্রতিভা দেখিয়েছিলেন যশ। এমনকি অর্জন করেছিলেন ব্ল্যাক বেল্টও। কিন্তু, একটি ঘটনাই বদলে দেয় সবকিছু। সোলাপুরে একটি স্টেট-লেভেল টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের নাকে ভুলবশত লাথি মেরে গুরুতর আহত করেন যশ।

রক্তাক্ত সেই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যান তার মা কাজল ঠাকুর। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আর নয় কারাতে। এরপরই যশের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রিকেট ব্যাট আর বল। সেই সিদ্ধান্তই তাকে পৌঁছে দেয় ভারতের জাতীয় দলে।
তবে ক্রিকেটের পথও তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। বিদর্ভের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে বারবার উপেক্ষিত হয়েছেন তিনি। জুনিয়র টুর্নামেন্টে একের পর এক ম্যাচে একাদশের বাইরেই বসে থাকতে হয়েছে। ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে ভারতের হয়ে ভালো পারফর্ম করার পরও জায়গা হয়নি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে।
যেখানে তার অনেক সতীর্থ দ্রুত জাতীয় দলে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেখানে যশকে বছরের পর বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে ঘাম ঝরাতে হয়েছে। প্রতিটি প্রত্যাখ্যানকে তিনি বানিয়েছেন নিজের শক্তিতে।

এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার বাবা। মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও কখনো ছেলের ক্রিকেটের স্বপ্নে অর্থের অভাব হতে দেননি রবি সিং ঠাকুর। নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে ছেলের ব্যাট, বল, কিট আর অনুশীলনের খরচ জুগিয়েছেন নীরবে।
কিন্তু ২০২৩ সালে সেই মানুষটিই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। বাবার মৃত্যু যেন মুহূর্তেই ভেঙে দেয় যশকে। তবু থেমে যাননি তিনি। কারণ তিনি জানতেন, তার বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একটাই—একদিন ভারতের জার্সিতে ছেলেকে খেলতে দেখা। সেই স্বপ্নকেই বুকে নিয়ে আবার মাঠে ফেরেন যশ। এরপর নেওয়া প্রতিটি উইকেট যেন হয়ে ওঠে বাবার উদ্দেশে একেকটি নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি।
২০১৭ সালে বিদর্ভের হয়ে লিস্ট-এ অভিষেকের পর ধীরে ধীরে দলের প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২১-২২ বিজয় হাজারে ট্রফিতে মাত্র সাত ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়ে ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। সেই পারফরম্যান্সই খুলে দেয় আইপিএলের দরজা।

লখনৌ সুপার জায়ান্টস ও পরে পাঞ্জাব কিংসের হয়ে খেলার সময় আন্তর্জাতিক মানের কোচ ও তারকা পেসারদের সঙ্গে কাজ করে নিজের বোলিংকে আরও শাণিত করেন। বিশেষ করে ডেথ ওভারের ইয়র্কার আর ধীরগতির বল তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
২৭ বছর বয়সে ভারতের জার্সি গায়ে যশ ঠাকুর শুধু নতুন এক পেসার নন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, জীবনের প্রতিটি প্রত্যাখ্যান শেষ নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন পথই নিয়ে যায় সবচেয়ে বড় স্বপ্নের ঠিকানায়।










