ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা কে?

ব্রাজিল — এই একটা নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফুটবলের সবচেয়ে কাব্যিক ইতিহাস। এমন একটা দেশ, যেখানে কিংবদন্তিরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, একজনের কাঁধের পেছনে আরেকজন, প্রত্যেকেই নিজের গল্প নিয়ে অপেক্ষা করে কখন তার নাম উচ্চারিত হবে। গিভ মি স্পোর্টস সম্প্রতি সেই সারি থেকে করেছে ব্রাজিলের ইতিহাসের সেরা ৩০ ফুটবলারের তালিকা। আর সেই তালিকাটাই এখন তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দীর্ঘতা, আন্তর্জাতিক সাফল্য, ক্লাব সাফল্য, কারিগরি দক্ষতা, গোল আর অ্যাসিস্ট — এই ছয়টি মানদণ্ডে বিচার করে সাজানো হয়েছে তালিকাটা। শুরুতেই যা হওয়ার কথা, তাই হয়েছে। সিংহাসনে পেলে — তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী, ফুটবলের রাজা, যাকে টপকানোর প্রশ্নই আসে না।

তাঁর ঠিক পাশেই রোনালদো নাজারিও, যার পায়ে বল মানেই প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভূমিকম্প। আর তিনে ১৯৬২ বিশ্বকাপে একা হাতে ব্রাজিলকে টেনে নেওয়া গারিঞ্চা — যার বাঁকানো পা নিয়েই তৈরি হয়েছিল ফুটবলের অন্যতম বড় রূপকথা। এরপরই শুরু বিতর্কের আসল জায়গাটা।

চারে রোনালদিনহো, পাঁচে রিভালদো — ২০০২ বিশ্বকাপের দুই জাদুকর, যাদের পায়ের কারুকাজ দেখে গোটা বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়েছিল একসময়। আর ঠিক তাদের পেছনেই, ছয় নম্বরে নাম লেখা রোমারিওর।

এই টপ ফাইভেই জায়গা হয়নি নেইমারের। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা — ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল, যে রেকর্ড এখনও কেউ ছুঁতে পারেনি — সেই নেইমার তালিকায় সাত নম্বরে। আর ঘটনাটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, তালিকা প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয় দল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিয়ে নিয়েছেন তিনি। একটা অধ্যায়ের শেষ, ঠিক যে সময় তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।

আটে জিকো, দশে জার্জিনহো — সত্তর দশকের সেই স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিরা এখনও শীর্ষ দশে টিকে আছেন গর্বের সঙ্গে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটা অপেক্ষা করছিল ঠিক পরের ধাপে। কাকা — ২০০৭ সালে ব্রাজিলের সবশেষ ব্যালন ডি’অর জয়ী খেলোয়াড় জায়গা পাননি শীর্ষ দশে। তার ঠিকানা ১২ নম্বরে। একটা দেশ যেখানে বিশ্বসেরার মুকুট পরা একজন খেলোয়াড়কেও দাঁড়াতে হয় লাইনের অনেক পেছনে, সেই দেশের প্রতিভার গভীরতা বোঝানোর জন্য বোধহয় আর কোনো উদাহরণের দরকার নেই।

তালিকার বাকি অংশ যেন এক-একটা পুরনো সিনেমার রিল। ১৯৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই কিংবদন্তি গোলের নায়ক কার্লোস আলবার্তো আছেন ১৪ নম্বরে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক রবার্তো কার্লোস ১৮-এ। ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রফিজয়ী খেলোয়াড় দানি আলভেস দাঁড়িয়ে আছেন ২৪ নম্বরে, আর ব্রাজিলের রক্ষণের নির্ভরতা থিয়াগো সিলভা ২৫-এ।

আর একদম শেষে, ত্রিশ নম্বরে, এমন একজন যাকে আজকের প্রজন্ম চেনেই না — দমিঙ্গোস দা গুইয়া। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের সেরা একাদশে জায়গা পাওয়া এই ডিফেন্ডারকে বলা হতো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে টেকনিক্যাল রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। তার নিজের নামে তৈরি হওয়া ড্রিবল ‘ডোমিঙ্গাদা’ একসময় প্রতিপক্ষের কাছে ছিল আতঙ্কের নাম।

তালিকা প্রকাশের পর থেকেই মন্তব্যের ঘরে চলছে বিতর্ক। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন নেইমারের অবস্থান নিয়ে, কেউ আবার ক্ষুব্ধ কাকার র‍্যাঙ্কিং দেখে। কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক — যে দেশে ‘সর্বকালের সেরা’ ঠিক করতে বসলে ব্যালন ডি’অরজয়ীকেও লাইনের বারো নম্বরে দাঁড় করাতে হয়, সেখানে বিতর্ক তো হবেই। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটা জাতির ফুটবল-ইতিহাস আসলে এতটাই সম্বৃদ্ধ যে, প্রতিটা র‍্যাংকিং শেষ পর্যন্ত একটা প্রশ্ন রেখে যায় — এই দেশে ‘সেরা’ শব্দটার মানে আসলে কী?

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link