প্রতিকূলতাকে বন্ধু বানানো আকিব নবী!

বড় স্বপ্ন দেখতে গেলে কী করতে হয়? অনেকে বলবেন কঠোর পরিশ্রম, হাল না ছাড়া আরও কত কী! তবে সবার আগে প্রতিকূলতার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়। যেটা সবাই পারে না। যারা পারে তাদের মধ্যে একজন আকিব নবী।

বড় স্বপ্ন দেখতে গেলে কী করতে হয়? অনেকে বলবেন কঠোর পরিশ্রম, হাল না ছাড়া আরও কত কী! তবে সবার আগে প্রতিকূলতার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়। যেটা সবাই পারে না। যারা পারে তাদের মধ্যে একজন আকিব নবী। বারামুলার ছোট্ট শহর থেকে শুরু হওয়া যে যাত্রা একসময় থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আজ সেটিই পৌঁছে গেছে ভারতের টেস্ট দলের ড্রেসিংরুমে।

জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুলা। দীর্ঘদিন অস্থিরতা, কারফিউ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করা একটি জনপদ। যেখানে অনেক শিশুর কাছে নিরাপদে বাড়ি ফেরা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়েছেন আকিব নবী। দেখেছেন কীভাবে মানুষ লড়াই করে স্রেফ বাঁচার জন্য, শিখেছেন কীভাবে লড়াইটা করতে হয়। সে লড়াইয়ের বড় অংশজুড়ে ঠাঁই পেল ক্রিকেট।

পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সেখানে নেই। থাকবে কী করে, আগ্নেয়াস্ত্রই যেখানে শাসকের ভূমিকা নেয়, সেখানে ক্রিকেট তো বিলাসিতার চরম পর্যায়। তবুও আকিব দাঁতে দাঁত চেপে চালিয়ে গেছেন নিজের প্রচেষ্টা। পাথুরে মাঠে অনুশীলন করেছেন, ৬০ কিলোমিটার দূরত্ব মাড়িয়ে দূরের একাডেমিতে গিয়েছেন ক্রিকেট শিখবেন, ভালো করেই শিখবেন বলে।

স্পাইক না থাকায় বন্ধুর কাছ থেকে ধার করেও ট্রায়াল দিয়েছেন। অন্যদের জন্য যে পথ ছিল কাঁটার, যে পথ ছিল দুর্গম গিরিখাত, আকিবের কাছে সেটাই ছিল ক্রিকেটজীবনের স্বাভাবিক এক অধ্যায়। তবে এখানেই শেষ নয়।

সংগ্রাম শুধু মাঠেই ছিল না, ছিল ঘরেও। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রথমদিকে তাঁর সমর্থন ছিল না। পরিবারেও আর্থিক চাপ ছিল প্রবল। এমনও সময় এসেছে, ছেলের ক্রিকেট চালিয়ে নিতে বাবাকে ঋণ নিতে হয়েছে। কিন্তু আকিব থামেননি। বাধাকে কাঁধে তুলে নিয়ে শুধুই ছুটেছেন, খাঁ খাঁ মরুভূমিজুড়ে একটু পানির সন্ধান তিনি করে গিয়েছেন।

তবে তাঁর পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে, যখন পরপর দুইবার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ট্রায়াল থেকে বাদ পড়েন। অনেকের কাছেই সেটি হতে পারত শেষ অধ্যায়। কিন্তু আকিব নতুন শুরুর উপলক্ষ পেয়ে গেলেন। সোনা যত আগুনের আঁচ পায়, সেটা ততই খাঁটি হয়। তিনি নিজেকে আরও শাণিত করেন। সুইং, লাইন-লেংথ, ফিটনেস—সবকিছুতেই এনে দেন আমূল পরিবর্তন। ধীরে ধীরে জম্মু ও কাশ্মীরের ঘরোয়া ক্রিকেটে হয়ে ওঠেন নির্ভরতার আরেক নাম।

রঞ্জি ট্রফিই বদলে দেয় তাঁর জীবন। ধারাবাহিকভাবে উইকেট শিকার, ম্যাচ জেতানো স্পেল আর লোয়ার অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৬০ উইকেট নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরকে ইতিহাসের প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও ওঠে তাঁর হাতে। এমন পারফরম্যান্সের পরও যখন জাতীয় দলে জায়গা হয়নি, তখন ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও নির্বাচক দিলীপ ভেংসরকার পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন—রঞ্জি ট্রফির এমন পারফরম্যান্সও যদি জাতীয় দলের দরজা না খোলে, তাহলে এই টুর্নামেন্টের মূল্য কোথায়?

এরপর আসে আইপিএল। দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে দলে ভেড়ায়। যদিও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসার পরও আকিব নিজেকে বদলাননি। তিনি বারবার বলেছেন, আলো নয়, নিজের উন্নতিতেই তাঁর মনোযোগ।

অবশেষে অপেক্ষার অবসান। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আগে জাসপ্রিত বুমরাহ চোটের কারণে ছিটকে গেলে ভারতের টেস্ট দলে প্রথমবারের মতো ডাক পান আকিব নবী। এটাকে কি শুধুই এক স্বপ্নপূরণের গল্প বলবেন?

ক্রিকেটে প্রতিভা অনেকেরই থাকে। কিন্তু প্রতিভাকে ইতিহাসে পরিণত করে যে জিনিসটি, তার নাম অধ্যবসায়। আকিব নবী সেই সত্যেরই জীবন্ত উদাহরণ। তিনি তো বুঝিয়ে গেলেন, পথ যত কঠিনই হোক, হাল না ছাড়লে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।

লেখক পরিচিতি

স্টাফ রিপোর্টার

Share via
Copy link