মুমিনুলের বীজ বোনা গাছে ডারউইনে জয়ের মহোৎসব!

স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে ৯ উইকেটের জয়। কিন্তু কিছু জয়ের আসল গল্প স্কোরবোর্ডে ধরা পড়ে না—সেই গল্প লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর আগে নেওয়া এক নিভৃত সিদ্ধান্তে। ডারউইনের এই জয়ও তেমনই এক ভিত্তির ফসল, আর সেই ভিত্তির কারিগর বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন আনসাং নায়ক—মুমিনুল হক।

স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে ৯ উইকেটের জয়। কিন্তু কিছু জয়ের আসল গল্প স্কোরবোর্ডে ধরা পড়ে না—সেই গল্প লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর আগে নেওয়া এক নিভৃত সিদ্ধান্তে। ডারউইনের এই জয়ও তেমনই এক ভিত্তির ফসল, আর সেই ভিত্তির কারিগর বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন আনসাং নায়ক—মুমিনুল হক।

মুমিনুলের অধিনায়কত্বের সময়টা ভালো যায়নি। ফলাফল পক্ষে আসেনি, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, শেষমেশ দায়িত্বও ছাড়তে হয়েছে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার কাছে সিরিজ হারের পর। কিন্তু তার ঠিক আগেই, নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে তার নেতৃত্বেই এসেছিল বাংলাদেশের অন্যতম বিস্ময়কর টেস্ট জয়। আর সেই সময়ে তিনি এমন একটা বীজ বুনেছিলেন, যার ফসল নিজে ঘরে তুলতে পারেননি—কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট পেয়েছে।

মুমিনুল নিশ্চিত করেছিলেন, বাংলাদেশ টেস্ট খেললে অন্তত তিনজন পেসার যেন একাদশে থাকে। শুধু জাতীয় দলে নয়—চট্টগ্রাম বিভাগ আর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক থাকার সময় থেকেই তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে তিন-চারজন পেসার খেলানোর চেষ্টা করতেন, এমনকি সমতল উইকেটেও। নিজের ভাষায় বলেছিলেন, দেশে জোরে বোলিং যেন মরে না যায়, সেজন্যই এই পরিকল্পনা। অধিনায়ক হওয়ার পর একই দর্শন এলো জাতীয় দলেও—দেশে তো জিতছি, এবার বিদেশেও জিততে হবে, আর স্পিনাররা বিদেশের উইকেটে অতটা সহায়তা পান না।

তখন ফলাফল আসেনি, কারণ পেস বোলিংয়ের কোরটাই তৈরি হয়নি। কিন্তু তামিম ইকবালের ভাষায়, মুমিনুলই সেই মানুষ, যিনি দেশের পেস বোলিংয়ের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়েছিলেন। তামিম নিজেই একসময় জিজ্ঞেস করতেন, কেন তিনি পেসার খেলাচ্ছেন, কেন কিউরেটরদের গতিময় উইকেট বানাতে বলছেন। মমিনুলের জবাব ছিল সহজ—নইলে এই দেশে জোরে বোলিং হারিয়েই যাবে।

আজ ডারউইনে দাঁড়িয়ে সেই সিদ্ধান্তের মূল্যটা স্পষ্ট হয়ে গেল। ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছিলেন, এই উইকেটে তিন পেসার নিয়ে খেলাটা বাংলাদেশের ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে—পেস নেই, বাউন্স নেই, সুইংও নেই, তার ওপর নাহিদ রানাও নেই। শুধু নেই আর নেই। তবুও বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়েই খেলল, আর তারাই জমে ওঠা জুটি ভাঙলেন, ভয়ংকর হয়ে ওঠা ব্যাটারদের ফেরালেন, ২০ উইকেট তুলে নিলেন, এমনকি দ্বিতীয় ইনিংসে মরে যাওয়া উইকেটে স্পিনারদের জন্যও পথ তৈরি করে দিলেন।

আগে বাংলাদেশকে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হতো, আজ বাংলাদেশ কন্ডিশনকে নিজের মতো ব্যবহার করতে শিখছে। এই বিবর্তনের সুতোটা বাঁধা এক আনসাং অধিনায়কের একটা নিভৃত সিদ্ধান্তে।

কিছু সিদ্ধান্তের ফল সঙ্গে সঙ্গে মেলে না, আসে বছরের পর বছর পর—এমন একদিনে, যেদিন আপনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দেন।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link