নামটা এতদিন লুকিয়ে ছিল স্কোরকার্ডের ভিড়ে—কখনো ৪০, কখনো তার চেয়েও কম। কিন্তু আজ, মালয়েশিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে, আদিল বিন সিদ্দিক যেন হঠাৎ করেই নিজের নামটা লিখে ফেললেন বড় হরফে। ১১১ বলে ১৩৫ রান—১৪টি চার আর ৪টি ছক্কার মালা গেঁথে গড়া এক ইনিংস, যা তাকে এতদিনের অচেনা এক মুখ থেকে বানিয়ে দিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কে এই আদিল বিন সিদ্দিক? প্রশ্নটা আজকের আগে খুব বেশি কেউ করেননি। ২০০৪ সালের ১ জুলাই জন্ম নেওয়া ডানহাতি এই উইকেটকিপার-ব্যাটার বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাদপ্রদীপের বাইরেই ছিলেন এতদিন। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গ্লাভস হাতে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, একই বছরের শেষদিকে আরব আমিরাতে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ জয়ী দলেরও অংশ ছিলেন। কিন্তু ব্যাট হাতে তার নাম তখনও দাগ কাটেনি কারও মনে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ২০২৪ সালের নভেম্বরে, কক্সবাজারে রাজশাহী বিভাগের হয়ে বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে। তিন ম্যাচের ছোট্ট অভিজ্ঞতায় ব্যাট হাতে জমা পড়েছিল মোটে ৭২ রান, গড় ১২—সংখ্যাগুলো বলছিল না কোনো ভবিষ্যতের গল্প। লিস্ট এ ক্রিকেটেও ছবিটা প্রায় একই—৬ ম্যাচে ১৫২ রান, সর্বোচ্চ সেই ৪০, ফিফটির মুখই দেখেননি কখনো। ২০২৫ সালের মার্চে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে লিস্ট এ অভিষেকের পর থেকে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগেও ছিলেন, তবে নীরবেই।

আজ সেই নীরবতা ভাঙল বজ্রনির্ঘোষে।
টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ শুরুতে হোঁচট খায়নি শুরুর দৃঢ় ব্যাটিং এর পর জাওয়াদ আবরার আর মইনুল ইসলাম তন্ময়ের ব্যাটে ৯৪ রানে দুই উইকেট হারায় দল। ঠিক তখনই তিন নম্বরে নেমে আসেন আদিল। শুরুটা যতটা না ঝড়ের, তার চেয়ে বেশি ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। কিন্তু সময় গড়াতেই যেন বদলে গেলেন তিনি—প্রতিটা বাউন্ডারিতে নিজের নামের পাশে জমতে থাকল আত্মবিশ্বাসের নতুন এক অধ্যায়।
খালিদ হাসানের সঙ্গে গড়ে ওঠে তৃতীয় উইকেটে ১৭৫ রানের এক দুর্দান্ত জুটি, যা ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়। খালিদ নিজেও ৮৬ বলে ৭৩ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন, কিন্তু মূল আকর্ষণ ছিলেন আদিলই। ১৪টি চার আর ৪টি ছক্কায় সাজানো তার ১৩৫ রানের ইনিংসটি যখন সৈয়দ আজিজের বলে থামে—ততক্ষণে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে এক বিশাল পুঁজির দোরগোড়ায়। ১৫৫ মিনিট উইকেটে কাটিয়ে যাওয়া আদিল যেন প্রমাণ করে গেলেন, বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য তার সবসময়ই ছিল—শুধু সুযোগটা মিলছিল না ঠিকঠাক।
আদিল ফেরার পরও থামেনি বাংলাদেশের রানের চাকা। রিজান হোসেন আর অধিনায়ক আহরার আমিন পিয়ানের রান আউটে ফেরাটা কিছুটা ছন্দপতন ঘটালেও, শেষদিকে ঝড় তোলেন শেখ পারভেজ জীবন। মাত্র ১৩ বলে ২৩ রানের অপরাজিত ইনিংসে ১৭৬.৯২ স্ট্রাইক রেটে তাণ্ডব চালিয়ে দলীয় সংগ্রহকে নিয়ে যান আরও উচ্চতায়। শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৩৬৯ রানে থামে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ ইনিংস।

আদিল বিন সিদ্দিকের ব্যাটে ভর করে আর শেষ দিকে জীবনের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে সফরকারী মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ ছুঁড়ে দিল ৩৭০ রানের পাহাড়সম টার্গেট। সিরিজে আগেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের সামনে এখন হোয়াইটওয়াশের হাতছানি, আর মালয়েশিয়ার সামনে অপেক্ষা করছে এক অসাধ্য সাধনের চ্যালেঞ্জ।
তবে আজকের দিনের সবচেয়ে বড় গল্পটা লেখা হয়ে গেছে অনেক আগেই—যখন এতদিনের অচেনা এক নাম, আদিল বিন সিদ্দিক, নিজের প্রথম বড় ইনিংসেই বুঝিয়ে দিলেন, “কে এই আদিল বিন সিদ্দিক”—প্রশ্নটা আর থাকবে না প্রশ্ন হয়ে।











