লাল-সবুজ স্বপ্নের প্রথম অদম্য বাতিঘর

সময়ের ঘূর্ণাবর্তে যখন চারপাশের বিশ্ব বাংলাদেশ ক্রিকেটকে স্রেফ এক নবীন প্রতিপক্ষ ভেবে মুচকি হাসত, ঠিক তখনই হাবিবুল বাশার সুমন নামের এক নি:সঙ্গ নাবিক সেই তাচ্ছিল্যের ঝড়ে প্রথম শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন।

সময়ের ঘূর্ণাবর্তে চারপাশের বিশ্ব তখন বাংলাদেশকে ভাবত এক অসহায় নবীন নাবিক। ঠিক সেই তাচ্ছিল্যের ঝড়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন। পরিসংখ্যান বা রেকর্ডের নিছক সংখ্যার হিসেব দিয়ে এই মানুষটিকে মাপা অসম্ভব। তিনি তো ছিলেন মূলত এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জয়ের লাল-সবুজ পতাকা পোঁতার প্রথম কারিগর।

রবীন্দ্র-লালনের শহর কুষ্টিয়ার মাটিতে ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই মানুষটির ক্রিকেটে হাতেখড়ি ছিল ত্যাগ আর সংগ্রামের গল্পে। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ১৯৯৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শারজায় ওয়ানডে অভিষেক হয় তাঁর। তবে আসল রূপকথা শুরু হয় ২০০০ সালে। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসে তাঁর দৃঢ়তাপূর্ণ লড়াই বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার বার্তা দিয়েছিল।

​ক্যারিয়ারের শুরুতে চোখ ও চোটের নানা জটিলতায় পড়তে হলেও সুমনকে থামানো যায়নি। ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল -এই সময়টায় যখন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ তাস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত, তখন তিনি একাই একপ্রান্ত আঁকড়ে ধরে একের পর এক লড়াকু ফিফটি উপহার দিতেন।

২০০৪ সালে নেতৃত্বের ব্যাটন হাতে নেওয়ার পর বাশারের হাত ধরেই জয় শব্দটার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত হয় বাংলাদেশ। সেন্ট ভিনসেন্টের প্রতিকূল কন্ডিশনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অনবদ্য শতক হাঁকিয়ে এনে দেন অবিস্মরণীয় ড্র। আর ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে সিরিজ জিতে বাংলাদেশকে উপহার দেন ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ জয়ের অমর গৌরব।

২০০৭ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপ ছিল বাশারের অধিনায়কত্বের এক অনন্য মাস্টারপিস। পোর্ট অব স্পেনে ভারতকে হারিয়ে বিদায় করে দেওয়া আর পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ধরাশায়ী করে বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় সৃষ্টি করার নেপথ্যে ছিল তাঁর অটল বিশ্বাস ও কৌশল। আজ আমরা যাদের বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপাণ্ডব বলে চিনি, তাদের কাঁচা বয়সে ভরসা দিয়ে, আগলে রেখে পরিণত করে তুলেছিলেন এই এক হাবিবুল বাশার।

২০০৮ সালে পেশাদার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পর তিনি বিসিবির জাতীয় নির্বাচক কমিটিতে দীর্ঘ এক দশক দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিসিবির নারী ক্রিকেট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নারী ক্রিকেটের প্রসারে নতুন মাত্রা যোগ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।

​হাবিবুল বাশার সুমন স্রেফ গাণিতিক খাতার কোনো পরিসংখ্যান বা রেকর্ডের তালিকা নন। তিনি হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই আদি ও খাঁটি ভিত্তিপ্রস্তর, যার অদম্য সাহস আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে যেকোনো পরাশক্তিকে হারানোর স্বপ্ন দেখে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link