​অলিম্পাস ছুঁয়ে লেখা ফুটবলের অমর মহাকাব্য

গ্রীক পুরাণে ট্রয় জয়ের জন্য কাঠের ঘোড়ার চাল চেলে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল গ্রীকরা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক ট্রয় জয়ের মতো আরেকটি মহাকাব্য লেখা হবে পর্তুগালের মাটিতে, তা ফুটবল বিশ্ব স্বপ্নেও ভাবেনি!

ইউরো ২০০৪ ছিল থিয়েরি অঁরি, জিনেদিন জিদান, লুইস ফিগো এবং উঠতি তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো নক্ষত্রপুঞ্জে ঠাসা এক মঞ্চ। আর সেই মঞ্চেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিস্ময় ঘটিয়েছিল গ্রিসের মতো একটি দল। যাদের ট্রফি জেতার সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্রেফ এক ‘কৌতুক’ হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছিল।

​গ্রীক পুরাণে ট্রয় জয়ের জন্য কাঠের ঘোড়ার চাল চেলে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল গ্রীকরা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক ট্রয় জয়ের মতো আরেকটি মহাকাব্য লেখা হবে পর্তুগালের মাটিতে, তা ফুটবল বিশ্ব স্বপ্নেও ভাবেনি!

জার্মান কোচ অটো রেহাগেল যখন গ্রিস জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন, তখন দলটি ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় অচেনা এক নাম। কিন্তু রেহাগেল গ্রীক দলে নিয়ে আসেন এক অভূতপূর্ব কৌশল।  কঠোর শৃঙ্খলা, জমাট রক্ষণভাগ এবং প্রাণঘাতী কাউন্টার অ্যাটাক। পর্তুগালে আয়োজিত এই আসরের উদ্বোধনী ম্যাচেই সবাইকে চমকে দিয়ে স্বাগতিক পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে যাত্রা শুরু করে গ্রিস। এরপর গ্রুপ পর্ব টপকে নকআউট পর্বে শুরু হয় তাদের আসল তাণ্ডব।

 

নকআউট পর্বে গ্রিসের ম্যাচ জেতার কৌশল ছিল একদম স্পষ্ট।ডিফেন্স সুরক্ষিত রেখে সেট পিস বা কর্নার থেকে একটি গোল আদায় করে নেওয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে দেয় তারা।

জিনেদিন জিদান ও থিয়েরি অঁরিদের আক্রমণকে পুরো স্তব্ধ করে দেন গ্রীক ডিফেন্ডাররা। সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ও উড়তে থাকা চেক প্রজাতন্ত্রকে অতিরিক্ত সময়ে ‘সিলভার গোল’ এ ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে গ্রিস।

​৪ জুলাই ২০০৪। লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ স্টেডিয়ামে ফাইনাল। প্রতিপক্ষ স্বাগতিক পর্তুগাল, যাদের দলে ছিলেন লুইস ফিগো ও উদীয়মান তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ঘরের মাঠে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল পর্তুগিজরা। কিন্তু ম্যাচের ৫৭ মিনিটে দেবদূত হয়ে আসেন গ্রিসের স্ট্রাইকার অ্যাঞ্জেলোস চারিসতেয়াস।

অ্যাঞ্জেলোস বা সিনাসের নিখুঁত কর্নার থেকে অসাধারণ এক হেডে পর্তুগালের জালে বল জড়ান তিনি। বাকি সময়টুকু রক্ষণের লৌহকপাট তুলে ধরে ১-০ গোলের জয় সুনিশ্চিত করে গ্রিস।

​লিসবনের বিষাদমাখা নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে সেদিন এথেন্সের রাজপথে নেমেছিল আনন্দের জোয়ার। তারকাদের দ্যুতি নয়, অবিচল সংকল্প দিয়ে রেহাগেলের গ্রিস প্রমাণ করেছিল – অলিম্পাসের অধীশ্বরদেরও যদি মর্ত্যে নামিয়ে আনতে হয়, তবে মহাকাব্যের প্রয়োজন পড়ে না, কেবল ১১টি জেনেশুনে লড়াই করা হৃদয়ই যথেষ্ট। ২০০৪ সালের সেই নীল-সাদা বিপ্লব ফুটবল ইতিহাসের ক্যানভাসে চিরকালের জন্য খোদাই করে দিয়ে গেছে – রূপকথা শুধু বইয়ের পাতাতেই নয়, সবুজ ঘাসেও জন্ম নেয়।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link