স্টোকসের মাস্টারস্ট্রোক ও হেডিংলির মহাকাব্য

হেডিংলিতে স্টোকসের এই ইংলিশ মহাকাব্য লেখার গল্প নিছক কোনো ক্রিকেটীয় ঘটনা নয়! বরং, এটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, জয়ের জন্য দলীয় একাত্মতা আর ত্যাগের এক অম্লান দৃষ্টান্ত!

খাতা-কলমে ম্যাচটা তখন প্রায় শেষের পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু কখনো কখনো ক্রিকেট বিধাতার আসল ইচ্ছে মানুষের পক্ষে বোঝা কেন অসম্ভব হয়ে ওঠে, তা সেদিন আরেকবার প্রমাণ করেন ইংলিশ অলরাউন্ডার বেন স্টোকস!

তারিখটা ছিল ২৫ আগস্ট, ২০১৯। ভেন্যু হেডিংলি। বিশ্বের চোখ তখন ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৭ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। কিন্তু, অস্ট্রেলিয়া ছাড় দেয়নি। থ্রি লায়ন্সদের উদ্দেশে ৩৫৯ রানের বিশাল লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয় অজিরা।

চতুর্থ দিনের সকালে ইংরেজদের মনে আশা জাগাচ্ছিলেন জো রুট এবং বেন স্টোকস। তবে, সম্ভাবনা জাগিয়েও ব্যক্তিগত ৭৭ রানে রুট বিদায় নিলে গোটা স্টেডিয়ামে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা!

কিন্তু, জনি বেয়ারস্টোকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান স্টোকস। দুজনে ৮৬ রানের এক দুর্দান্ত জুটি গড়ে ইংলিশদের আবার স্বপ্ন দেখাতে থাকেন। তবে, বেয়ারস্টো ৩৬ রানে ফিরে যেতেই যেন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ডের লোয়ার ব্যাটিং অর্ডার। জস বাটলার এক রান করে আউট হন স্টোকসের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে। ক্রিস ওকস, জোফরা আর্চার আর স্টুয়ার্ট ব্রডও সাজঘরের পথ ধরেন একে একে। আর্চার বাদে আর কেউই দুই অঙ্কের রানের ঘর ছুঁতে পারেননি।

২৮৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ড তখন দৃশ্যত ধ্বংসস্তূপ। পরাজয় তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। সিরিজ জিততে অজিদের প্রয়োজন আর মাত্র একটা উইকেট। বিপরীতে, ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য তখনো দরকার ৭৩ রান!

ঠিক এসময়ে ক্রিজে আসেন ইংল্যান্ডের ১১ নম্বর ব্যাটার জ্যাক লিচ। অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ডাররা তখন বিজয়ের হাসিতে মেতে ওঠার প্রতীক্ষায়। আর তখনই ক্রিকেট বিধাতার আসল ইচ্ছেটা সামনে ফুটে ওঠে!

 

ভিন গ্রহীদের মতো আগ্রাসী হয়ে পরাক্রমশালী অজি বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে একাই রুখে দাঁড়ান ৬০ রানে অপরাজিত থাকা বেন স্টোকস। নাথান লায়নকে চোখধাঁধানো রিভার্স স্লগ-সুইপ ছক্কা হাঁকিয়ে শুরু করেন তিনি। এরপর জশ হ্যাজেলউডের এক ওভারেই ঝোড়োগতিতে ১৯ রান তুলে শতক পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি। অপর প্রান্তে জ্যাক লিচও নেন ক্রিজে টিকে থাকার শপথ।

তবে খেলার সমাপ্তি ঘটতে পারত আবারও! কিন্তু ক্রিকেট দেবতার মনে তখন চলছিল স্টোকসের সব মাস্টারস্ট্রোকের সাহায্যে এক অনবদ্য মহাকাব্য রচনার প্রয়াস! সে কারণেই হয়ত প্যাট কামিন্সের বলে ব্যক্তিগত ১১৬ রানে স্টোকসের তুলে দেওয়া ক্যাচ হাতছাড়া করেন মার্কাস হ্যারিস।

শেষ মুহূর্তেও ম্যাচের উত্তেজনার পারদ নিচের দিকে নামেনি! স্টোকসের মারকুটে ব্যাটিং তোপে ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য যখন দরকার আর মাত্র দুই রান, তখন ফের নাটকের সূত্রপাত। সিঙ্গেল নিতে গিয়ে সংশয়ের মারপ্যাঁচে পড়ে লিচ প্রায় রান আউটই হতে বসেন তখন। কিন্তু লায়ন বল রিসিভ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বেঁচে যায় ইংলিশরা। ঠিক পরের বলেই স্টোকস পরিষ্কার এলবিডব্লিউ থেকে রেহাই পান আবার। অজি অধিনায়ক টিম পেইন আগেই রিভিউয়ের কোটা শেষ করে ফেলায় হেডিংলিতে ভাগ্যের দেবী যেন নিজ হাতে এঁকে দেন ইংল্যান্ডের জয়ের দৃশ্য!

অবশেষে ১২৬তম ওভারের চতুর্থ বলে কামিন্সের অফ-স্টাম্পের বাইরে করা বলকে সজোরে কাভার ড্রাইভের সাহায্যে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে স্টোকস ইংল্যান্ডের এক উইকেটের জয় নিশ্চিত করেন! শেষ পর্যন্ত ২১৯ বলে ১১ চার ও আট ছক্কার মারে ১৩৫ রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন তিনি। ইতিহাস ছোঁয়ার ম্যাচটিতে শেষ উইকেটে স্টোকস আর লিচ মিলে স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ৭৬ রান, যাতে মাত্র এক রানের অবদান ছিল লিচের।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link