রক্তাক্ত পতাকায় আঁকা ক্রোয়াট ইতিহাস

মাত্র চার মিলিয়ন মানুষের এক নতুন রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ করেই পরাশক্তিদের ধরাশায়ী করবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। তবে লাল-সাদা চেককাটা জার্সির দাম্ভিক উপস্থিতিতে ফরাসি গ্রীষ্মে তারা ছিনিয়ে নিয়েছিল বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়া – মানচিত্রে তখনও যাদের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দাগ কাঁচা, স্বাধীনতা অর্জনেরও বেশি দিন হয়নি। সেই ছোট্ট দেশটিই ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপে নাম লিখিয়েই রচনা করেছিল আধুনিক ফুটবলের অন্যতম অলৌকিক উপাখ্যান। মাত্র চার মিলিয়ন মানুষের এক নতুন রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ করেই পরাশক্তিদের ধরাশায়ী করবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। তবে লাল-সাদা চেককাটা জার্সির দাম্ভিক উপস্থিতিতে ফরাসি গ্রীষ্মে তারা ছিনিয়ে নিয়েছিল বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক।

​ক্রোয়েশিয়ার এই অপ্রতিরোধ্য যাত্রার নেপথ্যে ছিলেন মাস্টারমাইন্ড কোচ মিরাস্লাভ ব্লাজেভিচ। মাঠে এসি মিলানের কিংবদন্তি জোনিমির বোবানের নেতৃত্ব আর ড্রেসিংরুমে চিরোর মানসিক চার্জে গড়ে উঠেছিল এক দুর্ধর্ষ দল। ফরাসি এক আহত পুলিশ কর্মকর্তার সম্মানে পুরো টুর্নামেন্টে সাইডলাইনে নীল রঙের টুপি পরে ম্যাচ পরিচালনা করে আলাদা নজর কেড়েছিলেন এই কোচ।

গ্রুপ ‘এইচ’ এ ক্রোয়েশিয়া তাদের প্রথম ম্যাচেই জ্যামাইকাকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দেয়, যেখানে দলের পক্ষে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল করার গৌরব অর্জন করেন মারিও স্তানিচ। পরের ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে দাবোর শুকারের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানের জয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ক্রোয়েশিয়া। যদিও শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়ে গ্রুপ রানার্স আপ হিসেবে পরের ধাপে পৌঁছায় তারা।

রাউন্ড অব সিক্সটিনে রোমানিয়ার বিরুদ্ধে শুকারের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় তারা। তবে আসল রূপকথা লেখা হয় কোয়ার্টার ফাইনালে, যেখানে তৎকালীন ইউরো চ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী জার্মানিকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেয় ব্ল্যাজার্সরা। রবার্ট জার্নির দূরপাল্লার শট, গোরান ভ্লাওভিচের দূরন্ত গোল এবং শেষে শুকারের ক্লিনিকাল ফিনিশিং ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসকে বদলে দেয় চিরতরে।

সেমিফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়ে শুকারের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন দেখছিল ক্রোয়েশিয়ানরা। কিন্তু ফরাসি ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরামের অনবদ্য পারফরম্যান্সে ২-১ ব্যবধানে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।

তবে সেমিফাইনালের হতাশা কাটিয়ে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান ও ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করে ক্রোয়েশিয়া, যেখানে গোল দুটি করেন রোবার্ট প্রোসিনেচকি ও শুকার।

​এই অবিশ্বাস্য অভিযানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা দাবোর শুকার। টুর্নামেন্টের সাত ম্যাচের ছয়টিতেই গোল করে তিনি জয় করে নেন সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মানজনক ‘গোল্ডেন বুট’। ১৯৯৮ সালের সেই ক্রোয়েশিয়া প্রমাণ করেছিল, ফুটবলে ইতিহাস বা ভৌগোলিক আকারের চেয়ে দেশের জন্য আত্মত্যাগ আর আবেগই দিনশেষে শেষ কথা বলে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link