ম্যারাডোনা যাকে ওস্তাদ মানতেন

স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনার চোখেও তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার সর্বসেরা খেলোয়াড়। নাম তাঁর থমাস ফিলিপে কার্লোভিচ।

স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনার চোখেও তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার সর্বসেরা খেলোয়াড়। নাম তাঁর থমাস ফিলিপে কার্লোভিচ। রোজারিওর বেলগ্রানো পাড়ায় বেড়ে ওঠা এই বোহেমিয়ান ফুটবলারকে বিশ্ব চেনে ‘এল ত্রিনচে’ নামে। তিনি ছিলেন ফুটবলের এক রহস্যময় কবিতা। যা মাঠের রেকর্ড বইয়ে নয়, বরং মানুষের মুখে মুখে ফেরা লোকগাথায় অমর হয়ে আছে।

১৯৯৩ সালে ম্যারাডোনা যখন ইউরোপের পাট চুকিয়ে নিজ শহর রোজারিওতে ফিরে আসেন। তখন এক সাংবাদিক তাঁকে বিশ্বের সেরা হিসেবে স্বাগত জানান। কিন্তু ম্যারাডোনা জানান বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় ইতোমধ্যে রোজারিওতেই আছেন।

মাঠে কার্লোভিচ ছিলেন বিশুদ্ধ লাতিন ফুটবলের প্রতিনিধি। তাঁর ড্রিবলিং আর বল কন্ট্রোল ছিল দেখার মতো। তিনি বিশেষ পরিচিত ছিলেন তাঁর সিগনেচার ‘ডাবল নাটমেগ’ কৌশল। তিনি বলকে একবার সামনে নিয়ে আবার পেছনে টেনে প্রতিপক্ষের পায়ের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিতেন।

ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের। বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নামে রোজারিওর একটি স্থানীয় সম্মিলিত একাদশের বিপক্ষে। স্থানীয় একাদশে ছিলেন কার্লোভিচ। প্রথমার্ধেই সেই অখ্যাত দলের কাছে ৩-০ গোলে পিছিয়ে যায় জাতীয় দল। কার্লোভিচের ড্রিবলিং আর পায়ের জাদুতে জাতীয় দলের রক্ষণভাগ তখন খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে।

বিরতির সময় জাতীয় দলের কোচ প্রতিপক্ষ কোচের কাছে গিয়ে অনুনয় করেছিলেন যেন কার্লোভিচকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দল যদি এভাবে বিধ্বস্ত হয়, তবে খেলোয়াড়দের মনোবল থাকবে না। কার্লোভিচ মাঠ ছাড়লেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক অমর উপাখ্যান।

পরদিন জাতীয় দলের কোচ যখন তাকে বিশ্বমঞ্চে খেলার প্রস্তাব দিলেন, কার্লোভিচ খুব শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি এখন মাছ ধরছি, আমাকে বিরক্ত করবেন না।’ দেশের জার্সি, খ্যাতি বা অর্থের চেয়ে নদীর পাড়ে বসে বড়শি বাওয়া তাঁর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল।

কার্লোভিচের প্রতিভা ছিল ভিনগ্রহের। ইউরোপের নামী ক্লাব এসি মিলান কাড়ি কাড়ি টাকার প্রস্তাব নিয়ে তার দরজায় কড়া নেড়েছিল। তিনি স্রেফ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি ফুটবল সম্রাট পেলে নিজে যখন কসমস ক্লাবের হয়ে তাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কার্লোভিচ তাতেও সম্মতি জানাননি।

​কার্লোভিচ ছিলেন চরম পর্যায়ের ‘হোম সিক’। রোজারিও শহরটিই ছিল তার পৃথিবী। বড় কোনো ক্লাবের হয়ে খেলার চেয়ে পাড়ার মাঠে সেন্ট্রাল করডোবার হয়ে খেলতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর কাছে ফুটবল ছিল এক বিশুদ্ধ আনন্দ, কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়।

​পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারে কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই তাঁর। নেই কোনো বড় ট্রফি। যা আছে তা হলো মানুষের মুখে মুখে ফেরা অগণিত গল্প। ২০২০ সালে এই রোজারিওতেই এক ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারান এই নি:সঙ্গ সম্রাট।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link